মোহনের ২৫ শে মার্চের কাল রাত ~ উর্মি

সকাল হতে না হতেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়ে মোহন। উদ্দেশ্য একটাই ললিতাদের আম বাগানে খেলা করা।মোহন কালকেই তার বন্ধু আদু, দিপু ও মীরা কে বলে দিয়েছিল ললিতাদের আম বাগানে আসতে।
তবে মোহন আম বাগানে পৌছে দেখে ওরা এখনো এসে পৌছায় নি। মোহন মনে মনে বললো, ওদের বলেছিলাম সকাল সকাল আসতে ওরা এখনো আসলো না। মোহন হঠাৎ দেখে দিপু চলে এসেছে।
কি রে, এখন আসার সময় হলো নাকি(মোহন)?
আর বলিস না ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে রে ভাই(দিপু)।
আচ্ছা আদু আর মীরা কোথায় ওরা আসে নি এখনো (দিপু)
না আসে নি।মনে হয় না ওরা আজ আর আসবে। আমি বাড়ি যাব আজ খেলতে ইচ্ছে করছে না,তাছাড়া সকালে কিচ্ছু টি খাই নি। এখন বাড়ি ফিরে কিছু খাব তুইও বাড়ি যা(মোহন)।
ঠিক আছে আমিও বাড়ি যাচ্ছি বিকেলে কি আসবি(দিপু)?
হ্যা আসবো।

এই বলে ওরা বাড়ি ফিরে গেল। মোহন বাড়ি ফিরে জল খাবার খেয়ে নেয়। আর খাওয়া শেষ হলে যখনই বাইরের উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে তখনই মা বলে ওঠে, মোহন এখুনি বাজারে যা ঘরে কিচ্ছু টি নাই। কেন মা বাবা কোথায় বাবাকে বলো।
তোর বাবা জলখাবার খেয়ে বেড়িয়ে পড়েছে,পাশের গাঁ তে জুতো সেলাই করতে। সে আজ আর বাড়ি ফিরতে পারবে না।
ঠিক আছে মা, বাজারের থলে টা দাও,কি আনবো বলো।
এই নে এইটা দেখে সব মিলিয়ে আনবি।
ঠিক আছে ।

মোহন বাজারে যায়, সবার মুখে শুধু একটাই কথা শোনে ৭ ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষন অবশ্য ভাষনের বেশ কিছু দিন কেটে গেছে তাও সবার মুখে মুখে বঙ্গবন্ধুর ভাষনের কথাই এখন বেশি শোনা যায়। যাই হোক, মোহনের বাজার করা শেষ, বাড়ি ফিরে মোহন মাকে সব জিনিসপত্র দেয়এবং তার মাকে ৭ ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষনের কথা।

মা জানো বাজারে না সবাই শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাষনের কথাই বলছে আর এ-ও বলছে যে দেঐশে নাকি অনেক বড়ো বিপদ আসতে চলছে।
কি বলিস বাবা, তবে আমরা তো গ্রামে থাকি আমাদের কিছু ভয় নেই বল।
হ্যা মা ঠিকই বলেছো, মা আমি স্নান করতে গেলাম।

মোহন এই বলে নদীতে স্নান করতে যায়।বাড়ি ফিরে মাকে বলে,, মা খেতে দাও খিদে পেয়েছে, কি রান্না হয়েছে আজ?
কি আবার হবে ভাত, ডাল আর আলু বেগুনের ঝোল।
সব সময় আমার এক খাবার খেতে ভালো লাগে না।দাও খেতে দাও।
মোহন খাওয়া শেষ করে একটু নদীর পাড়ে বসে রইল। বেশ ভালোই লাগছিলো তার। হঠাৎ আদু আর দিপু ছুটতে ছুটতে এলো ওরা বললো গ্রামে নাকি কারা আসছে। মোহন বললো কারা আসছে কা বললো তোদের?
আদু,দিপু বললো ঠিক বলতে পারবো না রে জানিসমনি দাদা বললো তাই তোকে বলতে এলাম।

এই দিপু শোন মীরা কোথায় ওকে তো দু দিন ধরে দখছি না কি হয়েছে রে ওর?
ওর জ্বর হয়েছে।
তাই নাকি?
হ্যা

এই আদু আজকে সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ি আসবি, দিপু তুইও কিন্তু আসবি আজ সন্ধ্যায় মা মুড়ি মাখা বানাবে।
ঠিক আছে আমরা আসবো।
তোরা জানিস বাবা আজ বাড়ি ফিরবে না, পাশের গাঁয়ে জুতো সেলাই করতে গেছে। মা কে বলবো বাবা কে বলতে একটা নতুন জামা কিনে দিতে।দ্যাখ এই জামাটা কেমন ছিরে গেছে। ইস!
সত্যই তোর জামাটা ছিরে গেছে
হ্যা কালকে বাবা বাড়ি ফিরলেই আমাকে নতুন জামা কিনে দেবে। এই তোরা সন্ধায় আসিস কিনতু আমি বাড়ি যাই তাহলে।
আচ্ছা।

কিছুখন পর সন্ধ্যা হয়। আদু দিপু মোহনদের বাসায় চলে আসে। মোহনের মা তুলসীগাছ এ জল দেয় শাখ বাজায়।তারপর মোহন,আদু ও দিপু কে মোহনের মা মুড়ি মাখা খেতে দেয়। ওরা সবাই বেশ আনন্দের সাথে মুড়ি মাখা খায়।মুড়ি মাখা খেয়ে আদু দিপু ওদের বাড়ি ফিরে যায়।কিছু পরে মোহন ও তার মা রাতের খাওয়ার পর বিছানায় শুতে যায় মোহনের মা মোহনের পাশে শুয়ে মোহনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
মোহন মাকে বলে, মা কালকে কি আমায় বাবা নতুন জামা কিনে দেবে?
হ্যা দেবে এখন ঘুমাও। এই বলে মোহন আর মোহনের মা ঘুমিয়ে পড়ে।

গভীর রাত সবাই ঘুমাচ্ছে হঠাৎ এক বিস্ফোরণের শব্দে ঘুম ভাঙে মোহনের মায়ের, মোহনের মায়ের প্রচন্ড ভয় লাগে। তার পর অনবরত গোলাগুলির শব্দে মোহনের ও ঘুম ভেঙে যায়।
মোহন মাকে বলে,, মা বাইরে এতো কিসের আওয়াজ আমার খুব ভয় করছে ম।।
ভয় পাশ না কিছু হবে না আমাদের পালাতে হবে।
হঠাৎ মোহনদের উঠানে অনেক লোকের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এরপর মোহনদের দরজা কারা যেনো জোরে ধাক্কা দেয়।
তখন মোহনের মা বল,,, আমাদের পালাতে হবে মোহন চলআমরা জানলা দিয়ে পালাই, মোহন তুই আগে বেরিয়ে যা। তখন মোহন কিছু না বলেই জানলা দিয়ে বের হয়। মোহন ওর মাকে বলে,, মা তুমিও তারাতাড়ি বেরিয়ে পরো। যখনই ওর মা বেরুতে যাবে তখনই মিলিটারি রা ঘরে ঢুকে পড়ে আর মোহনের মাকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে মোহন তখন দাঁড়িয়ে সেটা নিরুপায় হয়ে দেখল।। মোহনের তখন বুক ফেটে কান্না পায়। তখন মিলিটারি রা মোহনদের বাড়িও পুড়িয়ে ফেলে। মিলিটারি রা যাওয়ার পর মোহন চিৎকার করে কাঁদে। ২৫ শে মার্চের কাল রাতে এভাবেই মোহনের মাকে মোহন হারায়। পরদিন সকালে শোনা যায় ২৫ শে মার্চের কাল রাতে নাকি মোহনের বাবা কেও মেরে ফেলা হয়। পরে ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। মোহন সকালে দেখে তার গ্রাম টি একটি ধ্বংসাত্মক নগরি তে পরিণত হয়েছে পুরো গ্রাম পুড়িয়ে ফেলে দিয়েছে মিলিটারি রা।

তখন আদু দৌড়াতে দৌড়াতে মোহনের কাছে আসে আর বলে, মোহন কাঁদিস না তোর মাকে আর বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে আমি জানি সব শোন মোহন মনকে শক্ত কর, জানিস দিপু আর ওর মা বাবা কেও মিলিটারিরা মেরে ফেলেছে আর মীরা রা গ্রাম ছেরে পালিয়ে গেছে এখন নাকি গ্রামে যুদ্ধ শুরু হবে তাই আমরাও আজ কলকাতায় চলে যাব তুইও আমাদের সাথে যাবি চল।
মোহন বলে,আমি যাব না তোরা যা আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করবো দেশকে শত্রু মুক্ত করবো, তুই যা আদু।
আদু তখন চলে যায়।মোহন এবার মুক্তিবাহিনী তে যোগ দেয় এবং ট্রেনিং নেয়।পরে দীর্ঘ ৯মাস যুদ্ধ করে মোহন। অবশেষে মোহনদের মতো বীর যোদ্ধাদের জন্য আমরা ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর আমরা বিজয় লাভ করি এবং পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক এক নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।

 

লেখিকা- সারা আক্তার ঊর্মি

শ্রেণী – একাদশ

সরকারি ইস্পাহানী কলেজ

উপজেলা – কেরানীগঞ্জ জেলা- ঢাকা

2 thoughts on “মোহনের ২৫ শে মার্চের কাল রাত ~ উর্মি”

Leave a Comment