শহীদ মানে – মেহেদী হাসান

গল্পের_নামঃ শহীদ মানে

 

ফেব্রুয়ারি মাস,১৯৫২ সাল।পূর্ব পাকিস্তানে বেশ উত্তেজনা মুখর পরিবেশ।বিশেষ করে ঢাকাতে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,সচিবালয় সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রীতিমতো সভা-সমাবেশ, মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।দাবি একটাই “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”।

১৫ বছরের ছেলে তপু তার মায়ের সাথে বস্তিতে থাকে।বাবা নাই তপুর।সারাদিন কাগজ কুঁড়িয়েই সময় কাটে তার।কাগজ বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়েই কোনো মতো দিন চলে তাদের।ওর মা ঠিকমতো হাঁটতে পারেনা।সারাদিন ছোট্ট ঘরটিতে শুয়ে থাকেন।

কয়েকদিন ধরেই ধর্মঘট মিছিল-সমাবেশ চলছে।২১ শে ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট এবং রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে ২০শে ফেব্রুয়ারি সরকারি এক ঘোষণায় ২১ শে ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।সরকারি সেই ঘোষণায় সভা-সমাবেশ,মিছিল এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।২১শে ফেব্রুয়ারি ১১ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় একটি সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১০ জন করে মিছিল বের করার।

তপু প্রতিদিনের মতোই কাগজ কুঁড়াতে বের হয়েছে,কাগজ কুঁড়াতে কুঁড়াতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এসে দেখে মিছিল বের হচ্ছে।তপু এর আগেও মিছিলে গিয়েছিল।তপু প্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আসে।অনেকের সাথে তার সখ্যতাও রয়েছে।তপু তার পরিচিত একজনকে দেখে….
তপুঃরাতুল ভাইয়া।এইহানে কি আজক্যাও মিছিল হইবো?
রাতুলঃহুম তপু।আজকেও মিছিল আছে।১০ জন ১০ জন করে যাব আজকে।আজকে মিছিল ঠেকাতে পুলিশ আসতে পারে বুঝছিস?বাড়িতে চলে যা।তুই ছোট মানুষ।আজকে মিছিলে যাস না।
তপুঃক্যান ভাইয়া।পুলিশে কি কইরবো?
রাতুলঃপুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ করতে পারে অথবা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে পারে।তুই বাসায় চলে যা।
তপুঃক্যান বাড়িত যামু ক্যান?আমিও মিছিলে যামু।আমিও কমু”রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।”
রাসেলঃযদি পুলিশ তোকে ধরে নিয়ে যায়।তারপর মেরে ফেলে?
তপুঃআমি মরণের ভয় পাইনা।গরীবের আবার মরণের ভয়!আমিও মিছিলে যামু।নিয়া যাইবা নাহি কও?
রাসেলঃআচ্ছা চল।

তপু অনেক সাহসী ছেলে।তপুর পাগলামির শেষ নাই।কিন্তু নিতান্তই বাধ্য ছেলে সে।তাইতো সবাই ওকে এতো ভালোবাসা।
মিছিল এগিয়ে চলেছে।”রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” স্লোগানে ধ্বনিত হচ্ছে চারিদিক।একটু পরে পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ শুরু করে এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।গ্রেফতার করে অনেককেই।তাও তপু পিছু হটেনি।অনবরত বলে চলেছে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি বর্ষণ শুরু করলে মিছিলের সামনের সারিতে থাকা তপুর বুকে বিদ্ধ হয় একটা গুলি।মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে সে।তবুও বলে চলেছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।পুলিশের গোলাগুলিতে বিদ্ধ হয়েছে আরো অনেকেই।তাদেরকে কোনো মতো ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।কিন্তু কয়েকজনের অবস্থা খুবই শোচনীয়। তাদের মধ্যে তপু একজন।বিকালে খবর আসলো ৪/৫ কে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।তাছাড়া কয়েকজনের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।খবর পেয়ে রাতুলরা মেডিকেলে যায়।তপুর নিথর দেহ পরে থাকতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাতুল।সেইসাথে তপুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে ওর মন।

বিকালে দাফন শেষে সবার সাথে তপুকেও কবর দেওয়া হলো।২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশাল শোক র‍্যালি বের হয়।সেখানেও পুলিশের হামলাতে বেশ কয়েকজন আহত হন।শোক র‍্যালি শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বসে শিক্ষক-ছাত্ররা পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা করছিলেন।এমন সময় ৪০ বছরের একজন মহিলা এসে বললেন,”এইহানে রাতুল কেডা?”
রাতুলঃআমিই রাতুল।আপনি কে?চিনলাম না তো।
মহিলাঃআমি তপুর মা।তোমার কথা তপু আমারে কইছিলো।তুমি নাকি খুব ভালো পোলা।আমার পোলাডা কালক্যা বাড়িত যায় নাই।আজক্যাও যায় নাই।তাই খুঁজবার আছি।তুমি কি আমার পোলাডাক দেখছো?
রাতুলঃ(কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নরম গলায়) আম্মাজান!তপু তো গতকাল শহিদ হয়ছে..
তপুর মাঃশহীদ মানে??
রাতুলঃশহীদ মানে যে মরে গিয়েও বেঁচে থাকে সবার মনে!
শহীদ মানে এক বীর যোদ্ধার গল্প!
শহীদ মানে এক আত্মত্যাগীর গল্প!
শহীদ মানে এক নিরস্বার্থপরের গল্প!
শহীদ মানে এক দেশপ্রেমিকের গল্প!
শহীদ মানে মায়ের কোল খালি করে এক ছেলের চিরপ্রস্থান!
চারিদিকে এতো মানুষ থাকা সত্ত্বেও কোনো কথা হচ্ছে না!কোনো শব্দ হচ্ছে না।এ যেন এক অবাক নিস্তব্ধতা!অদ্ভূত নিস্তব্ধতা!

তপুদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ বাংলায় কথা বলতে পারছি ঠিকই কিন্তু যদি আবার ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির মতো দিন আসে তাহলে আমরা কি পারবো বন্দুকের সামনে বুক এগিয়ে দিতে?আমরা কি পারবো নিজের জীবন বাজি রেখে মিছিল,সমাবেশ করতে?পারবো না।মুখে বলাটা যত সহজ করাটা ঠিক ততই কঠিন।আসুন না নিজের দেশকে ভালোবাসি!নিজের দেশের মানুষ গুলোকে ভালোবাসি!গড়ে তুলি আমাদের স্বপ্নের সেই “সোনার বাংলা”।
সকল ভাষাশহীদদের এবং ভাষা সংগ্রামীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।ভালোবাসা সকল মা ও বোনদের প্রতি যারা হারিয়েছিল তাদের ছেলেকে,,তাদের ভাইকে!

লেখকঃ মোঃমেহেদী হাসান
স্কুলের নামঃ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ,নিশিন্দারা,বগুড়া।

2 thoughts on “শহীদ মানে – মেহেদী হাসান”

  1. ধন্যবাদ এভাবে ওয়েবসাইটে আমার গল্প প্রকাশ করার জন্য।কৃতজ্ঞতার শেষ নাই!😇🥰

    Reply
    • এর পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। বিস্তারিত জানতে পারবেন খুব তাড়াতাড়ি।

      Reply

Leave a Comment