এই বাংলার ছেলে – অহনা

গল্পের_নামঃ এই বাংলার ছেলে

লেখিকাঃমোছাঃ সুমনা তাবাসসুম অহনা
স্কুলঃ পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বগুড়া

 

আনিক কানাডায় থাকে। আজ সে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসেছে। আনিক ও তার পরিবার আনিকের মামার বাড়িতে উঠেছে । সে বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশি কিছু জানে না। কিন্তু তার এ ব্যাপারে জানার আগ্রহ অনেক। এতদিনের ইচ্ছা পূরণ হবে আজ তার। কারণ তার মামা আজ তাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে এবং ঢাকায় ঘটে যাওয়া পুরনো ইতিহাস বলবে। আজ সে অনেক খুশি মামার সাথে ঘুরতে বের হয়ে। মামা তার ক্রাচ নিয়ে বের হয়েছে।

আনিকঃ মামা,আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?

মামাঃআমরা এখন যাচ্ছি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে নির্মিত একটি শহিদ মিনারে।

আনিকঃশহিদ মিনার!!! মানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস!!! এর ব্যাপারে আমি অনেক শুনেছি। কিন্তু কোনোদিন সামনাসামনি শহিদ মিনার দেখিনি।

মামাঃচলো আগে। তারপর দেখতে পারবে।

শহিদ মিনারে পৌঁছানোর পর–

আনিকঃবাহ😌!!! এর ব্যাপারে আমাকে কিছু বলবে, মামা??

মামাঃঅবশ্যই। তাহলে একটা গল্প বলি।

আনিকঃবল বল।

মামাঃ শোনো তাহলে। ফরিদপুরের মুরারিপুর গ্রামে থাকত এক লোক। পড়াশোনার কারণে তার গ্রাম ছেড়ে তাকে ও তার এক বন্ধুকে ঢাকায় থাকতে হতো।

আনিকঃলোকটির নাম কী?

মামাঃধৈর্য ধরো,মামা। আস্তে আস্তে সবই জানতে পারবে। তো, ঢাকায় তাদের ভালোই চলছিল। তবে ১৯৫২ সালে যে তাদের জীবনে এমন পরিবর্তন আসবে সেটা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। ১৯৫২ সালের ২৬ শে জানুয়ারি যখন পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ঘোষণা করে ছাত্রসমাজ তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। সেই লোক ও তার বন্ধটি খুবই রাগান্বিত ছিল সেই ঘোষণার ওপর। লোকটি তার বন্ধুকে বলল,” বন্ধু, চল আমরা আন্দোলন করি। আন্দোলনই একমাত্র পথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার। তারা আমাদের কথা শুনবে না। আমাদের আন্দোলন করতে হবে, ভাষা আন্দোলন!” লোকটির বন্ধু তখন লোকটিকে বলল,” হুমম…ভাষা আন্দোলন! একদিন আমরা মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করবই,ইনশাল্লাহ!” এরপর থেকে তারা দুইজনে সকল মিটিং-আলোচনায় অংশ নিতো। ধীরে ধীরে আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে ওঠে। তাই পাকিস্তান সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সকল মিছিল-মিটিং-সমাবেশ বন্ধ করে দেয়। তারপরেও দমে থাকেনি তারা দুইজন।আন্দোলনের জন্য ১০ জন করে মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত হয়। ২১ শে ফেব্রুয়ারি তারা দুইজনসহ আরও আটজনকে নিয়ে একটি মিছিল বের হয় ঢাকা মহাসড়কে। তাদের একটাই ভাষ্য,”রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। আমাদের দাবি মানতে হবে।” পাকিস্তানি পুলিশ এ খবর জানতে পারলে সেখানে উপস্থিত হয় এবং সাথে সাথে গুলিবর্ষণ শুরু করে। হঠাৎ করে একটি গুলি এসে লোকটির বন্ধুর মাথায় এসে লাগে।

মামা চুপ হয়ে গেলেন। অজান্তেই মামার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝড়তে লাগল। আনিক গুলি মাথায় লাগার কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। আনিক তার মামাকে বলল,”মামা,তারপর কী হলো? লোকটির বন্ধুর কি বেঁচে ছিল? আর লোকটির কী হলো?”

মামা তার দুই হাত দিয়ে চোখ মুছে বলল,”লোকটির বন্ধু লোকটির চোখের পলকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। লোকটি বুঝতে পারছিল না যে সে কী করবে। লোকটি বিশ্বাস করতে পারছিল না যে তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু আর বেঁচে নেই। তবুও লোকটি নিজের মনকে শক্ত করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে লাগলো, বলতে থাকল,”রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।” এবার একটি গুলি এসে লোকটির পায়ে লাগে। লোকটি হয়ত সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যায়।পরের দিন সে নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করে। হঠাৎ সে উপলব্ধি করে যে তার এক পা নেই। ডাক্তার তাকে বলে যে গুলিটি তার পায়ে অনেক গুরুতর জায়গায় আঘাত করে এজন্য তার পা টি কেটে ফেলতে হয়।
আনিক হঠাৎ ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে। আর বলে,”তাহলে মামা,সেই লোকটি কি তু-তু-তু-তুমি।
মামা বলেন,” হ্যাঁ রে, লোকটি আমি আর বন্ধুটি আমার প্রাণের বন্ধু তারিকুল।”
অশ্রুসিক্ত চোখে মামা বলেন,”শুধু আমি ও আমার বন্ধুই নয় এরকম আরও হাজারো মানুষ রয়েছে যারা কিনা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের দিয়ে গেছে আমাদের প্রাণের ভাষা, মাতৃভাষা বাংলা।”

আনিকের বুক ভাষা শহিদের জন্য গর্বে ভরে গেল।সে শহিদ মিনারের ওপর ওঠে গিয়ে ফুল দিয়ে সকল ভাষাশহিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং নিচে নেমে এসে তার মামাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
মামা খুশি মনে আনিককে বলেন,” অনেক বড় হও,মামা। বড় হয়ে দেশের জন্য অনেক ভালো কিছু কর।”😊😊

Leave a Comment