গল্পের আসর – সৈকত ইসলাম

গল্লের নামঃ ‘গল্পের আসর’

সময় কি আটকে আছে? সেই কখন মাগরিবের আযান হয়েছে, এখনো এশা’র আযান দিচ্ছে না কেন? আজিমের বেশ অস্থির লাগছে। টেলিভিশনের সামনে বসে আছে কিন্তু কিছুতেই ভাল লাগছে না তার। আজিম অনেক ছোট, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। এশা’র নামাজের পর গল্পের আসর বসে। এই নিয়টা বেশিদিন হলো শুরু হয়নি। আজ দিয়ে এক সপ্তাহ হবে, তার দাদা, আমজাদ সাহেব প্রতিদিন নানা রকমের গল্প করেন। নানা রকমের গল্প! কোনোদিন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, কোনোদিন রূপকথার গল্প, কোনোদিন ইতিহাস। আবার কোনোদিন ভূতপ্রেতের গল্প। এইতো কাল রাতেই ভূতের গল্প বললেন। আজিম ভীষণ পরিমাণে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। গল্প শোনার পর রাতে আর চোখে ঘুম-ই আসে না। অনেক কষ্টে শেষমেশ ঘুমটা আসলো। ঘুম থেকে উঠেই ভয়-টয় সব হাওয়া। বরং গতরাতের নিজের ভয় পাওয়ার কথা ভেবে সে হেসেছিলো।
এশা’র আযান শোনা যাচ্ছে। আজিম প্রায় ছুটে তার দাদার ঘরে গেল। দাদার পাশে বসতে পারলে আজিমের কাছে গল্প শোনার মজাটা দিগুণ হয়ে যায়। আজিম যায়গা মতো বসল। কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই তার চাচাতো ভাই আর পাড়াপড়শি জামান, কাইসার, আমর, রকিব ছাড়াও আরও অনেকে এসে ঘর ভরিয়ে ফেলল। তারা সকলেই আজিমের বয়সী।আজিমের দাদার জন্য একটা যায়গা সবসময় নির্দিষ্ট করা থাকে। সেখানে কেউ বসে না। তারা নিজেদের মধ্যে হইচই করতে ব্যস্ত থাকল। আজিম চুপচাপ নিজের যায়গায় বসে থাকল। তার এসব হইচই করতে ভাল লাগে না। আমজাদ সাহেব নামাজ পড়ে আসলেন। গতকালের তুলনায় আজকে বাচ্চাদের সংখ্যা বেশি দেখে তিনি বেশ আনন্দিত হলেন। তিনি এসে সালাম দিয়ে সবাইকে চমকে দিলেন, তারা কেউ তাঁকে ইতোমধ্যে লক্ষ্যই করে নি। বড় একজনের সালাম পেয়ে তারা সবাই খানিকটা ভড়কে গেল। দ্রুত সালাম নিয়ে পালটা সালামটাও দিয়ে ফেলল। আমজাদ সাহেব সালাম নিতে নিতে তাঁর যায়গায় বসলেন। ‘তোরা আছিস কেমন?’, আমজাদ সাহেব মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন। সবাই সমস্বরে বলল, ‘আমরা ভাল আছি। তুমি কেমন আছো?’ ‘আছি, আছি। ভাল আছি। আল্লাই অনেক ভালা রাখছে।’ আজিম দাদার পাশ থেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘দাদাজান, আজ কিসের গল্প বলবা?’
‘কিসের গল্প শুনতে চাস?’
‘তুমি যা বলবা তাই শুনবো। তোমার সব গল্পই আমার খুব ভাল লাগে।’
আমজাদ সাহেব মুচকি হাসলেন। তিনি দেখলেন আজিমের চোখভরা কৌতূহল। তিনি বাকিদের দিকে তাকালেন, তাদেরও একই অবস্থা। তিনি বললেন, ‘আজ আমি তোদের ভাষা অর্জনের গল্প শুনাবো। এই বাংলা ভাষার। যে ভাষার জন্য জীবন দিতে হয়েছে। রক্ত দিয়ে ভাষাকে অর্জন করতে হয়েছে। তোরা শুনবি তো?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, শুনবো। অবশ্যই শুনবো।’ মিলিত কণ্ঠে জবাব আসলো।
‘তাহলে শোন। আমার একটা বড় ভাই ছিল। তোরা জানিস?.. তোরা কিভাবে জানবি। তোদের তো কেউ আগে বলে নি। আচ্ছা, আমি বলছি, শোন। আমার ভাইয়ের নাম ছিলো খালিক আহাম্মেদ। আমার বড় ছিলেন তিনি। এই ধর, দশ কি পনেরো বছরের বড়। আমি তাঁকে অতি সম্মান করতাম। তিনিও আমারে খুউব ভালবাসতেন। আমার বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন ভাইজান শহরে গেলেন, উচ্চশিক্ষার জন্যে। মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েভর্তি হয়েছিলেন, আমার ঠিক মনে নেই। আমি তো তখন ছোট ছিলাম। নইলে আমাকেও নিয়ে যেতেন। ওখানে কোনো ভাল স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতেন। আমার অবশ্য গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার কোনো শখ-আহ্লাদ ছিল না। আচ্ছা, যাইহোক, ভাইজান যখন গেলেন তখন সালটা ছিল… এই মনে হয় ৫১। হ্যাঁ, ১৯৫১। গেলেন বছরের একেবারে শেষ সময়, বছর পুরতে আর বাকি ছিল এক মাস। ভর্তি হয়ে জানুয়ারি মাসে ভাইজান আমাদের কাছে চিঠি লিখলেন; তখন তো আর এখনকার মতো মোবাইল ছিল না। ভাইজানের চিঠি পেলাম অর্ধেক মাস পর। চিঠিতে তিনি ভর্তি হওয়ার কথা লিখেছিলেন। আমাদের কাছে দোয়া চাইলেন। তারপরেই দেশে বেঁধে গেল ঝামেলা। ভাষা নিয়া ঝামেলা। আমাদের উপরে ভাষা চাচ্ছিল দিতে চাচ্ছিল ওই পাকিস্তানিরা। কিন্তু ওরা তো জানতো না যে বাংলার দামাল ছেলেরা নিজের মা’কে যতটা ভালবাসে ঠিক ততটাই ভালবাসে তার মায়ের ভাষাকে। মায়ের ভাষা, মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার জন্য তারা জীবনও দিতে প্রস্তুত। দামাল ছেলেরা সংগ্রাম করা শুরু করলো। মিছিল, হরতাল, আরও যত যা লাগে সব চলতে থাকলো। এর মধ্যে খালিক ভাইয়ের আবার একটা চিঠি আসলো। চিঠিতে তেমন কিছু লেখা ছিলো না, শুধু ছিলো, “আমি ভাষার জন্য লড়তাছি। আমি মরলে তোমরা কেউ যেন দুঃখ কইরো না।” সেটাই ছিল তার শেষ চিঠি। দাড়া, আমার কাছে চিঠিটা আছে, দেখাচ্ছি।’
আমজাদ সাহেব নিজের পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে একটা কাগজ বের করলেন। কাগজ সকলের দিকে মেলে ধরলেন। আজিম দেখল অস্পষ্ট আর আঁকাবাঁকা অক্ষরে কিছু লেখা আছে। সে পড়তে পারলো না। আজিম তার দাদাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘দাদাজান, তুমি সংগ্রাম করো নি, ভাষার জন্য, মায়ের ভাষার জন্য?’ আমজাদ সাহেব মুচকি হেসে বললেন, ‘আমি? আমি তো তখন ছোট ছিলাম। তখন আমি তোর থেকেও ছোট ছিলাম। আমি কিভাবে সংগ্রাম করবো!’ বসে থাকা অন্যরা সবাই বলতে থাকল, ‘তারপর? তারপর কি হলো?’
আমজাদ সাহেব সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তারপর একদিন রেডিওতে ভাষার সংগ্রামে মৃতদের নাম ঘোষণা থেকে আমরা খবর পেলাম ভাইজান মারা গেছেন। তাঁকে ঐ পাকিস্তানিরা গুলি করে মেরেছে।’
আমজাদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর আনমনে গাইতে থাকলেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি!’ আজিম লক্ষ্য করলো তার দাদার চোখের কোণায় পানি জমেছে। সে একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থাকলো। তার মনে একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে, এত দিন ধরে দাদাজান চিঠিটা কিভাবে আগলে রেখেছেন? পাশের ঘর আজিম মায়ের ডাক শুনতে পেল, ‘আজিম, আজিম.. ভাত খাবি না, বাবা? তারাতারি আয়।’

লেখকঃ সৈকত ইসলাম
ঠিকানাঃ গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা
স্কুলঃ নুরজাহানপুর অবঃ সামরিক কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়।
ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর।

Leave a Comment