ছিনিয়ে আনবো স্বাধীনতা ~ সৈকত ইসলাম

শফিক আর রফিন প্রায় দৌড়ে দৌড়ে গ্রামের দিকে আসছে। তাদের চলার মধ্যে হটকারিতা ভাব-টা স্পষ্ট। তাদের দেখে মনে হচ্ছে যেন তারা কোনো ঘোরের ভিতরে আছে। চেহারায় হাশিখুশির ভাব-টাও স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। দুপুর বেলা। চারদিকে রোদ্দুর, কিন্তু তা খুব বেশি প্রখর না। মৃদু রোদ্দুর আবহাওয়া-টাকে বেশ আরামদায়ক করে তুলেছে। রাস্তার পাশের পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা আফজাল রহমান তাঁদেরকে দৌড়াতে দেখে বেশ অবাক হলেন। তিনি তাঁদের হাতের ইশারা দিয়ে থামতে বললেন। তারা থামলো। আফজাল রহমান এলাকার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। পঞ্চাশোর্ধ এই ব্যাক্তিটি এলাকার সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। এলাকার মানুষজন নানা সময় নানা বিষয়ে তাঁর কাছেই পরামর্শ নেন। এক্ষেত্রে সবসময়-ই তিনি তাঁর জ্ঞান আর প্রজ্ঞার প্রমাণ দিয়েছেন। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর খুব বেশি নয়। তিনি রফিন আর শফিককে জিজ্ঞেস করলেন, কি হইছে রে তোগো? এত হাসিখুশি ক্যান তোরা? কিসের এত আনন্দ? তারা দু’জন এবার একটু শব্দ করে হাসলো। একটু রহস্য করে বলল, হ চাচা, আইজকা তো অনেক খুশির দিন। ক্যান, আপনে জানেন না? আফজাল রহমান বললেন, না তো। আমি তো এমন কিছু জানি না,যাতে এত্ত খুশি হওয়োন যায়। তারপর চোখমুখ যথাসম্ভব গম্ভীর করে বললেন, সে যাই হোক। দেশের যে অবস্থা, এর মইধ্যেও তোরা যে হাসিখুশি থাকতে পারছোস – এইডাই তো অনেক। আফজাল রহমানের কথা শেষ হওয়ার আগেই রফিন বলে উঠলো, আর চাচা শোনেন, সন্ধ্যায় কিন্তু জমিরের চা’য়ের দোকানে সামনে আপনারে আইতে হইবো। আইজকা একটা ছোট সভা করোন লাগবো। আমরা এহন যাইতেছি সবাইরে খবর টা দিতে। সবাইকে একসাথে একটা খুশির কথা জানানোর জইন্যে সভা করোনের কথা ভাবছি। আপনে মুরুব্বি মানুষ। আপনেই কোন তো দেখি, এইডা করা কি আমাদের আবার কোনো ভুল টুল হইবো নাকি? আফজাল সাহেব আবার অবাক হলেন। সভা! কি এমন কথা জানাতে চায় এরা? তিনি নিজের বিস্ময়টা প্রকাশ না করে বললেন, দেখ, তোরা যা ভাল মনে করিস, কর। তোরা এহন বড়ো হইছোস। এহন তোগো মইধ্যে সিন্ধান্ত নেয়োনের ক্ষমতা হইছে। ভুল টুল কিছু করার আগে তো তোগো বিবেক-ই তোগো সাবধান কইয়া দিবো। আমারে জিগানোর দরকার পরবো না। শফিক বলল, জ্বে চাচা। তাইলে আমরা ভুল কিছু করতাছিনা মনে হয়। এহন তাইলে যাই চাচা? সক্কলকে জানাইতে হইবো সন্ধ্যায় সভার কথা টা। বলে তারা উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলতে শুরু করলো। কিছুদুর গিয়ে পিছনে ফিরে শফিক আবার বলল, চাচা, মনে কইরা আইসেন কিন্তু।

সকলকে আসার কথা বলা শেষ। বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। শফিক আর রফিন গ্রামের মসজিদ থেকে চট এনে জমিরের চা’য়ের দোকানের সামনের ফাঁকা যায়গাটায় বিছিয়ে দিলো; সকলের বসার উপযোগী করলো। সেখানে অনায়াসেই শ’দুয়েক মানুষ বসতে পারবে। রফিন ইতোমধ্যেই পাশের গ্রাম থেকে একটা রেডিও নিয়ে এসেছে। তাদের গ্রামে কোনো রেডিও নেই। লোকজন আসতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার মধ্যেই অনেক লোক পৌছে গেল। তারা এত লোকের উপস্থিতিতে বেশ তৃপ্তি পেল। আফজাল রহমানও এসেছেন। তাঁকে বিশেষভাবে সামনে বসানো হয়েছে। সামান্য উঁচু একটা টেবিলের উপরে রেডিও টা রাখা হয়েছে। লোকজন নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন করছে। নানারকম কথা। সামান্য রকমের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। শকিফ রেডিও-র একটা বোতাম চেপে সেটাকে চালু করে দিলো। দৃঢ় কণ্ঠে কে যেন কথা বলছে! সবাই মুহুর্তের মধ্যেই চুপ হয়ে গেল। সেই কণ্ঠস্বরকে তাঁরা সবাই মনযোগ সহকারে শুনছে। এ তো মুজিবের কণ্ঠ! শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠ ইতোমধ্যেই দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করেছিলো। মুজিব কথা বলছে ইংরেজিতে। তাই তাঁরা কথাগুলোর কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু তবুও তাঁরা অনেক অগ্রহ নিয়ে তা শুনছে। মুজিবের কথা শেষ হতেই রেডিওতে অন্য একজন তা অনুবাদ করে শুনালো। এবার তাঁরা সেটা বুঝতে পারলো। শেখ মুজিবুর রহমান দেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেছেন। শফিক বোতাম চেপে রেডিও টা বন্ধ করে দিল। তারপর সকলের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলো, আইজকা আমি আর রফিন শহরে গেছলাম। সেখানে জানতে পারলাম বঙ্গবন্ধু গতরাইতে দ্যাশ স্বাধীনের ঘোষণা দিছে। শুইনা আমাগো খুব ভাল্লাগছে। তাই জইন্যে সবাইরে জানানোর লাইগা এ্যাইভাবে একটা সভা করোনের কথা ভাবছি। আপনাদের সবাইরে একসাথে জানাইতে পাইরা এখন মন টা শান্তি পাইতাছে। যদিও কাল রাইতে ঢাকায় অনেক মানুষরে ওই হানাদাররা মাইরা ফেলাইছে। যা আমাদের জইন্য খুবি কষ্টের কথা। কিন্তু, স্বাধীনতার ঘোষণা টা আমাদের জইন্য এক বিরাট পাওয়া। যে পাওয়ার কাছে কাল রাইতের মানুষের মউত গুলারে বিনিময় হিসেবে ধইরা নেয়োন যায়।

এরপর শফিক থামলো। সে বসলো। রফিন দাঁড়ালো। সে বলতে শুরু করলো, আপনেরা সবাই আইছেন, এর জইন্যে আপনেদের অনেক ধইন্যবাদ। আপনারা আর একটা খরব জানেন না। সেটা হইতাছে যে, কাল রাইতে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হইছে। শহরে যাইয়া আমরা এগুলা জানবার পারছি। তাঁকে গ্রেফতার করা হইছে রাইত প্রায় ১ টা ৩০ মিনিটে। তাঁর আগেই তিনি আমাদের স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা কইরা দিছেন। তিনি ঘোষণা টা দিছিলেন ইংরাজিতে, যাতে কইরা বিশ্ববাসী সেইটা বুঝবার পারে। পরে সরকারি অন্য কর্মকর্তারা সেটাকে বাংলায় পড়ে শুনাইছে। যেগলা রেডিও বা টেলিগ্রামে প্রচার করা হইছে। রেডিওতে আপনাদের আইজকা শুনানো হইলো। তাইলে আজ থাইকা আমরা স্বাধীন, আমাগো দেশ স্বাধীন, দেশবাসী সবাই…
আফজাল রহমান রফিনকে থামিয়ে দিলেন। নিজে বললেন, রফিন, তুই তো ভুল বুঝতাছোস। তুই বিষয়টা বুঝোস নাই। স্বাধীনতা জিনিসটা এত সহজে পাওয়া যায় না। আর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিলেই যে দ্যাশ স্বাধীন হইয়া যাইবে – এমন নয়। স্বাধীনতা শুইনাই কি ওই হানাদাররা দ্যাশ ছাইড়া পোলায়ে যাইবো? বল শুনি। যাইবো তারা? কেউ কোনো কথা বলল না। সবাই চুপ করে থাকলো। সেখানে বিরাজ করছে পিনপতন নিরবতা। আফজাল রহমান সেই নিরবতাকে ভাঙলেন ; নিজের প্রশ্নের জবাব নিজেই দিলেন, না, তারা যাইবো না। তাদের তাড়াইতে হইবো। দ্যাশ থাইকা তাড়ায়া বিদায় করতে হইবো। স্বাধীনতা ছিনায়ে আইনতে হইবো। পারবা তোমরা? পারবা?… পারবা?.. নিজেদের জীবনটা বাজি রাইখতে? বলো, পারবা?
সবাই আবার চুপ করে থাকলো। তাঁদের কাছে হয়তো এ প্রশ্নেব জবাব নেই, অথবা তাঁদের জীবন বাজি রাখার মত সাহস নাই? শফিক দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠলো, হ, ছিনায়ে আনবো। স্বাধীনতা ছিনায়ে আনবো ওই হানাদারদের থাইকা। ধীরে ধীরে অন্যরাও কথা বলতে শুরু করলো। সবাই সম্মত হলো। সবাই নিজেদের সাহসিকতার পরিচয় দিলো। মাঝবয়সী, কম বয়সী, প্রায় বয়স্ক যারা ছিলেন সবাই উঁচু কণ্ঠে বলতে থাকলো, হ, আমরা আনবো, স্বাধীনতা ছিনায়ে আনবো।
আফজাল সাহেবের প্রাণ ভরে উঠলো। দেশের জন্য সবার ভালবাসা দেখে তিনি আনন্দিত হলেন। শফিক আর রফিনের মধ্যে নেতৃত্বদানের সুপ্ত প্রতিভা তাঁকে খানিকটা অবাক করলো, কিন্তু আবার তাঁর ভালোও লাগলো। তিনি মনে মনে একবার বললেন, স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হইবো।

 

লেখকঃ সৈকত ইসলাম
ঠিকানাঃ গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা
স্কুলঃ নুরজাহানপুর অবঃ সামরিক কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়।
ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর।

Leave a Comment