অনেক কেঁদেছি, আজ আর কাঁদবো না ~ সুরাইয়া মাহমুদ

দুর্জয় রেসকোর্স ময়দানের ভেতরে বসে আছে। কিসের যেন অপেক্ষা ওর রক্তের কণায় কণায় শিহরণ জাগাচ্ছে। ওর চোখেমুখে উত্তেজনার ছাপ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। দুর্জয় লাখো মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে ভাবছে-“কিসের যেন একটা আকর্ষণ ! শুধু আমাকেই না, এই লাখো মানুষকে এখানে টেনে এনেছে। কখন আসবেন তিনি? সেই ভোর থেকে অপেক্ষা করছি শুধু তার কথা শোনার জন্য। আমাদের দেশটাকে মুক্ত করার জন্য তিনি কি বলবেন আমাদেরকে? আমরা কি রাখতে পারব তার কথা? পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে আমরা কি বেরোতে পারব?” -কিরে কি ভাবছিস? এই বলে ফাহাদ দুর্জয়ের কাঁধে হাত রাখলো। দুর্জয় চমকে উঠে বললো- “ভাবছি কিভাবে মুক্তি পাবো আমরা? ইয়াহিয়া খান তো বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন না”। -দেখ! বঙ্গবন্ধু আমাদের কি নির্দেশ দেন। আমরা তাই করবো। এমন সময় আশেপাশের লোকজন আবেগে আপ্লুত হয়ে বললেন- ওই যে আমাদের বঙ্গবন্ধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন। দুর্জয়ের মনে হচ্ছে স্বাধীনতার যে সূর্য ১৭৫৭ সালে পলাশির প্রান্তরে অস্ত গিয়েছিল আজ সেই সূর্যেরই উদয় হচ্ছে। দুর্জয়ের চোখে তারার ঝিলিক। দুর্জয় খুব মন দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কথা শুনছিল। বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের এই ভাষণের প্রতিটি কথা দুর্জয়ের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বঙ্গবন্ধু যখন বললেন – “মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ”- তখন দুর্জয়ের মনে হলো বঙ্গবন্ধুর এককথায় দেশের জন্য সে জীবনও দিতে পারে। রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষ লোকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো ঐ মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে এক তেজদীপ্ত সূর্য, যার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের হৃদয়ের আনাচে কানাচে আর তার সাথে ছড়িয়ে পড়ছে দেশ স্বাধীন করার এক অদম্য স্পৃহা, সেই স্পৃহা বুকে নিয়ে দুর্জয় বাড়ির দিকে গেল। পথের বাঁকে, গলির মোড়ে- মোড়ে, চায়ের দোকানে সব জায়গাতেই দুর্জয় শুনতে পেল বঙ্গবন্ধুর সেই জ্বালাময়ী ভাষণ-“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা”।এ ভাষণ শুনে দুর্জয় বুঝেছিল বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতার কথা না বললেও আভাসে বুঝিয়ে দিয়েছেন এখন সময় এসেছে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করার। অপেক্ষাটা শুধু বঙ্গবন্ধুর একটা নির্দেশের। এসব ভাবতে ভাবতে দুর্জয় বাড়ি ফিরে গেল। গিয়ে দেখল মা ঠাকুর ঘরে বসে আছে ‌ আর প্রার্থনা করছে-“ঠাকুর ওই হায়েনাগো হাত থেইকা আমাগো মুক্তি দ্যাও, দ্যাশের মাইনষেগো বাঁচাও, আমার ছেইলেডারে রক্ষা করো। আমরা হিন্দু বইলা ওই পাকিস্তানিরা আমগো মানুষ মনে করে না। শুনছি ওরা নাহি পাখির মতন কইরা মানুষ মারে। আমার ছেইলেডা রাতবিরেতে বাহিরে ঘোরাঘুরি করে, তুমি ওরে রক্ষা করো ঠাকুর, রক্ষা করো। দুর্জয়কে দেখেই মা আঁচলে চোখ মুছলেন। দিনের পর দিন চলে যেতে লাগল পুরো মার্চ মাস জুড়েই ঢাকাসহ সারাদেশে মিছিল-সমাবেশ চলতে লাগলো।এদিকে দুর্জয় মা ও ছোট বোনকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের পাশে ছোট্ট একটা বাড়িতে থাকে। দুর্জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় আপাতত ক্লাস বন্ধ, তাই সে বাড়িতেই থাকে পরিবারের সাথে। ফাহাদ সহ আরো অনেক বন্ধুর সাথে সে প্রতিদিন মিছিলে যোগ দেয়। কারণ সেদিন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু নামক সেই তেজদীপ্ত সূর্যের দ্যুতি অন্তরে ছড়িয়ে পড়ে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তা তার রক্তের কনায় কনায় শিহরণ জাগিয়েছে। দেশের জন্য লড়তেই হবে এই কথাটি তার অন্তরে গেঁথে গেছে।

২৪ মার্চ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সমাগত মিছিলকারীদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন,সেখানে দুর্জয়ও ছিল। ওখান থেকে বাড়িতে এসে দেখে মা ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। দুর্জয়কে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো-” কই ছিলি রে বাপ? হেই বৃদ্ধ মা ডারে একলা রাইখা তুই কই চইলা যাস? জানোস না তুই, আমার ডর লাগে ! ঘরে তোর কুমারী বইন রইছে। ওই পাকিস্তানিরা আমগো বাঁইচতে দিব না বাপ, হিন্দু বইলা কি আমরা মানুষ না?” বৃদ্ধ মায়ের কান্নার বেগ ক্রমেই বেড়ে চলছে। দুর্জয় কে জড়িয়ে ধরে মা বললেন-“বাপ রে ! তুই আমার একটা কথা রাখ, মরণ যদি হয়ই হগ্গোলে একলগে মরমু। তুই ওই মিছিলে আর যাইস না বাপ। ঠাকুর না করুক, তোর ভালো-মন্দ কিছু হইয়া গেলে আমি বাঁচুম না রে বাপ। তুই আর যাইস না”।মায়ের কান্না দেখে দুর্জয় কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলল মা চোখের জল ফেইলো না আর, আমি তোমাগো লগেই থাকুম।

রাত সাড়ে বারোটা। দুর্জয়ের গায়ে খুব জ্বর। বৃদ্ধ মা পাশে বসে ছেলের মাথায় জল ঢালছেন। দুর্জয়ের বোন দুর্গাও পাশে বসে আছে। বাইরে অনেক লোকের চিৎকার ও আর্তনাদ শুনে মা দুর্গা কে বলছেন-” অহ দুগ্গা,কিসের এত চেঁচামেচি বাহিরে ? আবার মাইনষের কান্দনের শব্দও শোনা যাইতেছে”। এমন সময় খট করে একটা গুলির শব্দ হলো। দুর্গা মাকে বলল-“মা, হেইডা তো গুলির শব্দ, আর শব্দডাতো ঐযে দাদায় যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ঐ হল গুলান থেইকা আইলো। ওমা কি হইতাছে এইসব ! ও দাদা ! দাদা ! চোখ মেলাও দাদা, তোমাগোর হল গুলান হইতে বন্দুকের শব্দ আইতেছে, কত মাইনষের কান্দন শোনা যাইতেছে”…… দুর্জয় জ্বরের ঘোরে বলল-” তাহলে কি ওরা হত্যাযজ্ঞ শুরু করে দিলো ?” এবার মা কেঁদে উঠলেন-“হে ঠাকুর ! বাঁচাও আমাগো। ও দুজ্জয়, বাপ রে ! হেইবার আমাগো পালা, হিন্দগো বাঁইচতে দিবোনা। হে ঠাকুর, আমরা কি পাপ করছি, কও কি পাপ করছি ?” এমন সময় দরজায় শব্দ হলো ঠক ঠক ! সবাই মুহূর্তের মধ্যেই শান্ত হয়ে গেল আর অন্তরে ছড়িয়ে গেল এক ভয়ের বার্তা। কেউ দরজা খুললো না, আবার শব্দ হলো ঠক ঠক !
– দুর্জয়, দরজা খোল।
মা চমকে উঠে বললেন- ক্যাডা ডাকতাছে ?
– কাকিমা, আমি ফাহাদ, দরজা খোলেন। অহ দুগ্গা ! যা তো, দরজা খুইলা দে।
দুর্গা গিয়ে দরজা খুলে দিল। ফাহাদ হাঁপাতে হাঁপাতে বললো-” কাকিমা, ওই হায়েনার দল গণহত্যা শুরু করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোতে ঘুমন্ত ছাত্রদের গুলি করে মারছে। এখন হিন্দু এলাকাগুলোতে আক্রমণ চালাতে এসেছে। কাকিমা, চলেন । আমি আপনাদের নিতে এসেছি। এখনই পালাতে হবে”। বৃদ্ধ মা ভয়ে কেঁদে ফেললেন,
– ও বাপ, দুজ্জয়ের জ্বর আইছে, আমি কই যামু ওরে লইয়া ?”ফাহাদ বলে উঠলো-” একটু আগে ওরা বঙ্গবন্ধুকেও গ্রেফতার করেছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। এখন যুদ্ধ শুরু হবে, এই দেশকে মুক্ত করতে হবে আমাদের”।
…… হঠাৎ মনে হল বুট পায়ে কয়েকজন খটখট করে হাঁটছে তাদের বাড়ির সামনে। দুর্জয়ের মা বলে উঠলো-” ও বাপ, চোখ খোল। ভয়ে আমার কইলজা শুকাইয়া যাইতেছে। ওই জানোয়ারেরা আইয়া পড়ছে, আমগো পালাতে হইবো”।
দুর্গা বলে উঠলো-” মা, কাইন্দো না। সাহস আনতে হইবো মনে। এহন না কাঁইন্দা দাদারে লইয়া কি করন যায় তাই ভাবতে হইব।”
খুব জোরে একটা শব্দ হলো। সবাই ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে। এমন সময় কে যেন কর্কশ গলায় বলে উঠলো- “দারওয়াজা খোল দো, আন্দার কন হ্যায় ? জালদি দারওয়াজা খোল‌ দো। আগার নেহি খোলোগে তো, হাম দারওয়াজা তোর কার আন্দার চালা যাউঙ্গা”। দরজায় আঘাত ক্রমেই বেড়ে চললো। দুর্জয়ের মা শুধু ঠাকুরকে ডাকতে লাগলো। দুর্জয় ফাহাদকে ধরে উঠে বসলো। দুর্জয় ফাহাদ কে বলল-” তুই জানালা দিয়ে পালিয়ে যা, ওরা এখনই দরজা ভেঙে ফেলবে, আমরা কোনভাবেই আর পালাতে পারবোনা। মাকে কথা দিয়েছি মরলে সবাই একসাথেই মরবো”। কিন্তু বৃদ্ধ মা তখন হঠাৎ করে বলে উঠলো-” তাইলে এই দ্যাশটার কি হইবো? তগো মতন সোনার টুকরো ছেলে যেই দ্যাশে রয় সেই দ্যাশটারে বাঁচানোর দায়েত্বও তগো, তোরা ক্যান মরবি? আমি মরুম, কিন্তু তগো মরতে দিমু না। আর যানি কাউকে মরতে না হয় ঐ জন্যি তগো বাঁইচতে হইবো।”

দরজা ভাঙ্গার আওয়াজ হলো। মায়ের আদেশে ওরা সবাই লুকিয়ে পরলো, ভাঙ্গা দরজা দিয়ে ওরা দেখতে পেল অদূরে একটা জলপাই রঙের গাড়ি, এবার একজন মিলিটারি বলল- “তুম হিন্দু হ্যায় ?” বৃদ্ধ মা ভয় আরষ্ট হয়ে কিছু বলতে পারলেন না। মিলিটারি ধমকে উঠে বলল-“ইছ ঘার সার্চ করো, ইয়ে হিন্দু কা ঘার হ্যায়”, মিলিটারি দুটো ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো। দুর্গাকে দেখে একজন বলে উঠল-” ইয়ে তো বেহেসত কা হুর জেইসা, বহুৎ খুব সুরত হো লাড়কি “বৃদ্ধ মা বুঝলেন ওদের আর কেউ বাঁচাতে পারবে না সময় উপস্থিত। তাই তিনি ইশারায় ছেলেকে নির্দেশ দিলেন পালানোর জন্য। কিন্তু দুর্জয় কেঁদে উঠে বলল- “আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না।”

– আমার মাথা খা তুই, তোরে এই দ্যাশের লাইগা যাইতেই হইবো। তোর মা-বইনের মত আরো মা বইন যাতে এই পশুগো হাতে না মরে ঐ জন্যি যাইতে হইবো তোরে। তোর নাম রাখছি দুজ্জয়, তোর বাপে কইছে দুজ্জয় মানে হইল যারে নাহি দমানো যায় না। তাইলে তুই কাঁন্দোস ক্যান বাপ ?” দুর্গাও বলে উঠলো-” হ দাদা, আমগো যা হয় হোউক, তোমারে আমার দিব্যি, তুমি চইলা যাও অনেক দূরে, যুদ্ধের জন্য তৈয়ার হও। পালাও দাদা। আমরা হিন্দু বইলা আমাগো এরা ছাইড়া দিবো না। আর কোনো হিন্দু গো যানি এগো হাতে মইরতে না হয় ঐ জন্য তোমাগো যুদ্ধ করতে হইবো। বঙ্গবন্ধু যা কইয়া গেছে তা মানতে হইবো। আমার দিব্যি যাও দাদা ! ফাহাদ দুর্জয়ের হাত ধরে পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে গেল। মিলিটারিরা ওদের পিছে ছুটে গেল, গুলি ছুড়লো, দুর্জয়ের পায়ে গুলি লেগেছে। ওরা কোথায় যেন একটা লুকিয়ে পড়ল। মা আর দুর্গা অশ্রুভরা চোখে দুর্জয়দের চলে যাওয়া দেখলো……একজন মিলিটারি দুর্জয়ের মাকে বলল,-” তেরে লাড়কা কো ভাগা দিয়া ! দিখা তা হু মাজা”। বৃদ্ধ মা গর্জে উঠে বলল-” বেশ করছি, তোগো যা ইচ্ছা কর। মাইরা ফ্যাল আমগো, জানোয়ারের বাচ্চা !”
এরপরই একটা গুলির শব্দ শোনা গেল আর সেই সাথে দুর্গার আর্তচিৎকার…… দুর্জয় ও ফাহাদ দূরের একটা ঝোপের আড়াল থেকে সব শুনলো। দুর্গার কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। শুধু বাড়তে লাগলো মানুষ নামধারী ঐ পশুদের উল্লাস। রাগে, ঘৃণায় আর অসহ্য যন্ত্রনায় দুর্জয় ফাহাদকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। ওর পা থেকে রক্ত ঝরছে। ফাহাদ একটা গামছা দিয়ে ওর পা বেঁধে দিলো। দুর্জয় আবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
-না জানি আমার মা আর বোনের কত কষ্ট হইছে। আমি তাদের বাঁচাতে পারলাম না।
-কাঁদিস না দুর্জয়, কাকিমা তো বললেন দেশের আর সবাইকে বাঁচাতে আমাদের লড়াই করতে হবে। কাকিমার মতো হাজারো মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে হবে।
– আর কত কাঁদবো আমি ? আর কত কাঁদবে এই বাংলার মানুষ ? না জানি ঐ পশুরা আজ কত নিরীহ মানুষকে মেরে ফেললো। এত মানুষের চোখের জল কি বিফলে যাবে ? ওই হায়েনারা শাস্তি পাবেই, আমরাও দেখিয়ে দেবো এই বাংলার মানুষ চাইলে কি করতে পারে। অনেক কাঁদিয়েছে কিন্তু আর না, আজ ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছেন আমরা স্বাধীন। এবার আমাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে।

ফাহাদ ও দুর্জয় শরণার্থীদের সাথে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করে। দুর্জয় জানেনা তার মা ও বোনের লাশ কোথায় ? হয়তো শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খেয়েছে। অস্ত্র চালনায় পারদর্শীতা অর্জন করে দুর্জয় ভাবে, যে বন্দুকের গুলি দিয়ে ওই পশুরা তার মা-বোনকে মেরেছে ওই বন্দুকের গুলিই ওদের কাল হবে। দুর্জয় এখনও কাঁদে, যখন মা-বোনের মুখটা মনে পড়ে। আবার কোন এক রাতে ওই আকাশের তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে- আমরা তো আজ স্বাধীন, মা গো ! যেদিন আমরা স্বাধীনতা পেলাম সেদিনই তুমি চলে গেলে। ও দুর্গা, দেখতে পাচ্ছিস ? তোর দাদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। আমার চোখের সামনে আমি আর কাউকে এভাবে মরতে দেব না । তোদের বাঁচাতে পারিনি আমি, তোর কান্না শুনেও আমি কিছু করতে পারিনি বোন। তুই যদি আজ বেঁচে থাকতিস তাহলে বলতাম- অনেক কেঁদেছিস বোন, আজ আর কাঁদবি নাহ তুই, আমি তোকে বলতে পারলাম না।

মা গো ! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, কোথায় তুমি ? বলেই কেঁদে ফেলল দুর্জয় আর তখনই হঠাৎ দুর্জয়ের মনে হলো মা যেন ওর চোখ মুছে দিয়ে বলছে-” আর কাঁন্দিসনা বাপ, অনেক কাঁন্দাইছে আমগো ওই নরপশুরা। হেইবার ওগো পালা, ক দেহি বাপ, মুখ ফুইটা একবার ক আমি শুইনা প্রানডা জুড়াই”।
দুর্জয় তখন ওই আকাশ পানে চেয়ে বলে উঠলো-” অনেক কেদেছি মা, আজ আর কাঁদবো না…. আজ আমরা স্বাধীন”। বলেই দেখল মা তো কোথাও নেই ! এতো নিছকই মায়া, একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো ও।

সত্যি মা কোথাও নেই শুধু রাতের তারা ভরা আকাশ টাই থেকে গেল মাথার ওপর। আর অন্ধকারের আড়ালে থাকা ঝিঁঝিঁ পোকার রিনরিনে আওয়াজ টা দুর্জয়ের কানে বাজতে লাগলো। সেই আওয়াজটাতেও যেন দুর্জয় শুনতে পেল সেই কথা-” অনেক কেঁদেছি, আজ আর কাঁদবোনা…. কারণ আমরা আজ স্বাধীন।”

নাম: সুরাইয়া মাহমুদ
শ্রেণী: একাদশ
কলেজ: সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজ, বগুড়া।
উপজেলা: বগুড়া সদর
জেলা: বগুড়া

5 thoughts on “অনেক কেঁদেছি, আজ আর কাঁদবো না ~ সুরাইয়া মাহমুদ”

Leave a Comment