রক্তে লেখা স্বাধীনতা ~ রাতুল আহমেদ

গল্পের নামঃ রক্তে লেখা স্বাধীনতা

রাত নিঃস্তব্ধ,হালকা হালকা বাতাস বইছে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই।মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে কুকুরের আর্তনাদ। সবাই নিঘোর ঘুমে ঘুমাচ্ছে। চারদিকটা সুনসান, নীরব। হঠাৎ বাতাস বেয়ে শোনা যাচ্ছে চড়মড় চড়মড় পায়ে হাঁটার শব্দ। আস্তে আস্তে আওয়াজটা বাড়তে থাকলো। মনে হচ্ছে অনেক মানুষ হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল্ গুলোর দিকে যাচ্ছে। রাতুল,রিদয়ওসম্রাট রেডিও শুনছে। হঠাৎ তারা কিছুটা শব্দ শুনতে পেল। তারা হকচকিয়ে গিয়ে রেডিও বন্ধ করে নিরব হয়ে আছে। কিছুক্ষন পর কেমন একটা শব্দ শুরু হতে লাগলো। রাতুল ভয় পেয়ে সম্রাটকে বলল,”ভাই কীসের শব্দ এটা?”ও বলল,”হয়তো রাইফেলের গুলীর শব্দ।”তারা আচঙ্কীত হয়ে ঘরে চুপ হয়ে থাকল। পরদিন সকালে রাতুল,রিদয় ও সম্রাট ঘুম থেকে উঠে বাইরে হাঁটতে গেল। হাঁটতে হাঁটতে তারা গত রাতের কাহিনী নিয়ে আলোচনা করছিল। রাতুল বলল,” চল বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোর কাছে গিয়ে দেখি কি হয়ছিল গত রাতে।” তৎক্ষনাৎ সম্রাট বলল,” নারে ওখানে গিয়ে কাজ নেই।” কে জানে কি অবস্থা ওখানে এখন। রিদয় বলল,”শোন, সাহস করে একবার যায়,দেখি কি হয়েছে?” তারা হাঁটতে হাঁটতে হল গুলোর গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়, আর তখন তারা গেটের ভেতরে উঁকি মেরে যা দেখল তা দেখার জন্য তাদের সেই মন মানসিকতা ছিল না। তারা হকচকিয়ে গিয়ে চিৎকার করল এবং বলতে লাগল,”লাশ লাশ!!” তখন সেখানকার লোকাল কিছু লোকজন ছুটে আসল। তারা সেখানে যেয়ে দেখল কিছু ছাএ হলের বাইরে মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তাদের রক্তে ভিজে গেছে সেখানকার মলিন মাটি। তারপর সবাই মিলে তাদের জানাজা পড়ে গণকবর দিয়ে দিলো।

বিকেল বেলায় রাতুল আর রিদয় মাঠে যায়। সেখানে সম্রাট ও বাকি বন্ধুরাও ছিল। তারা সবাই মাঠের এক কোণে আম গাছ ছিল সেখানে বসল। সোওয়াদ বলল তার চাচা নাকি কয়েক দিন ধরে নিরুদ্দেশ। ইমনও বলল আমার ফুপাতো ভাইও অনেক দিন ধরে বাড়ি ফিরে নাই। রাতুল একটু গভীর ভাবে ভাবছিল তখনই রিয়াদ দৌড়ে এসে হাঁপিয়ে বলল বাজারে নাকি মিলিটারির এক হিংস্র দল আসবে। রাতুল রিদয় এবং বাকি সবাই দৌড়ে বাড়ি যেতে লাগল। কিন্তু সম্রাট বলল আমার একটা পরিকল্পনা আছে যার দ্বারা হয়তো মিলিটারীরা ওখান থেকে চলে যাবে। রাতুল বিস্ময়ে বলল কী পরিকল্পনা। সম্রাট বলল এই পরিকল্পনা সফল হতে সবারই কিছু না কিছু সাহায্য করতে হবে। তারপর তারা সবাই বাজারের দিকে রওনা হলো। যেতে যেতে সম্রাট কিছু ইট,আর ফটকা নিলো আরও সাথ নিলো কিছু লাঠি। তারপর্ সম্রাট বাজারের সবাইকে একএিত করে তার পরিকল্পনা সম্পর্কে সব কিছু জানালো এবং সেই অনুযায়ী বোঝালো। সবাই সম্রাটের প্ল্যান অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। যখন মিলিটারির দল বাজারে হানা দিতে আসল তখনই সম্রাটের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হলো। একজন প্রথমে আড়ালে থেকে একটি বড় ইট তাদের গাড়ীর ওপর ছুড়ে মাড়ল। সাথে সাথে গাড়ীরটা থেমে গেল। মিলিটারিরা একটু ভয় পেল। তারা চারপাশে নজরদারি করল কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না।চারদিকটা জনমানবহীন ছিল। সম্রাট তার বন্ধুদের সাথে মিলে ফটকা ফোটাতে লাগল। মিলিটারিরা এবার সত্যি সত্যি ভয় পেল। তারা সামনে এগোতে ভয় পাচ্ছিল। তাদের একজন বলল,”কেয়া হুয়া আগে বারো হামারি যাবাজ সিপাহি। হামলোগ এইছি মামুলি আওয়াজ ছে ডারংগে নেহি। উন ডারপোক অর নামারদ লোগোকো মারকে জায়েংগে। ওদিকে সম্রাট ও গ্রামের সবাই তাদের পরিকল্পনা সফল করার পুরো চেষ্টা করছে। মিলিটারিরা খুব ভয় পেয়ে আছে। রাতুল ও রিদয় মিলে পাথর ছুঁড়ে মারছে গাড়ীর ওপর। তারপরে দেখা গেলো মিলিটারিরা চলে গেলো বাজার থেকে। সবাই আড়াল থেকে বেরিয়ে আসল। সবাই খুব খুশি সম্রাটের ওপর।

একদিন সকালে সম্রাট আর রাতুল মাঠে যাচ্ছে। হঠাৎ তারা শুনতে পেল কারও প্রিয়জন হারাবার বেদনাদায়ক কান্নার আওয়াজ। তারা আওয়াজটি শুনে তারাতাড়ি ছুটে গেল সেখানে। তারা দেখল একজন মা তার ছেলেকে আর একজন স্ত্রী তার স্বামীকে হারিয়েছেন। রিদয় দৌড়ে এসে বলতে লাগল,”যুদ্ধ যুদ্ধ”!!! রিদয় হাঁপাচ্ছে। সম্রাট বলল,দীর্ঘ নিশ্বাস নে আর হালকা ভাবে নিস্বাস ছেড়ে দে। রিদয় শান্ত হয়ে বলল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমাদের সবাইকে যুদ্ধ করতে হবে। রাতুল বলল,আমরা কী যুদ্ধ করতে পারবো!! সম্রাট বলল, মনে সাহস রাখ আর মনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখ। আমাদের যুদ্ধ করতেই হবে। মনে নেই তোর আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী বলেন, “আমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে লড়াই করতে হবে”। অর্জন করতে হবে স্বাধীনতার রক্তে লেখা এই বাংলাদেশ। সম্রাটের কথা শুনে রাতুল বলল চল প্রস্তুতি নিয়। রাতুল,সম্রাট,রিদয় আরও অনেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করল। যুদ্ধ করতে করতে সম্রাটের বুকে গুলি লাগলো। সাথে সাথে সম্রাট মাটিতে পড়ে গেল। তবুও সে আবার চেষ্টা করে ওঠে এবং জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে। শেষ মুহুর্তে সে. মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। রাতুল আর রিদয় তাকে পরে যেতে দেখে দৌড়ে আসল। রাতুল বলল শহীদের রক্ত কি তা আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে। দেশকে স্বাধীন করার জন্য তুই জীবন বাজি ধরেছিলি।আমরা তোর জন্য গর্ববোধ করি। তোকে প্রাণ ভরে সন্মান করছি। তারপর কিছুক্ষণ সবাই নিরব থাকল।সম্রাট তার রক্তে মাটিতে লিখে দিল স্বাধীনতার রক্তে লেখা বাংলাদেশ।

 

মো:রিদয় আহমেদ রাতুল
কলেজ:ধুনট সরকারী ডিগ্রি কলেজ, ধুনট,বগুড়া শ্রেণী:একাদশ

Leave a Comment