এক নিশ্চুপ গণহত্যা ~ আরিয়ান

পরিচিতি: সময়টা তখন ১লা মার্চ , ১৯৭১। গ্রামের ৪টি বড় বাড়ির মধ্যে একটি খানবাড়ি। এই বাড়ি এক একান্নবর্তী পরিবারের।বিধায় কর্তার বয়স অনেক ও তার তিন ছেলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও মেজো ছেলে সংসারের হাল ধরেছে । যদিও তারা দুই জনই সরকারি কর্মকর্তা । ছোট ভাই মাত্র দুই বছর আগে ব্যারিস্টারি পাস করে । কিন্তু এখনো চাকরি পায়নি । বড় ভাইয়ের দুই ছেলেমেয়ে । ছেলের বয়স ১৭ বছর এবং মেয়ের বয়স ৮ বছর । ছেলের নাম কবীর , মেয়ের নাম কণিকা । ঘরের মেজ ভাইয়ের দুই ছেলে ও এক মেয়ে । দুই ছেলের বয়স যথাক্রমে ৪ বছর ও ১৫ বছর । ছোটটির নাম রায়ান ও বড়টির নাম রাকিব । তাদের পাঁচ বছরের বোনের নাম রিক্তা । কণিকা ও রিক্তার মধ্যে খুব মিল । তারা একসাথে খেলে ,পুতুলের বিয়ে দেয় । বাড়ির ছোট ভাই এখনো বিয়ে করেনি।

মূল গল্প: ঘরের প্রত্যেকেই একদম খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিল । দেশের জন্য সকল পর্যায়ে যেতে পারে খানবাড়ি । এরপর হঠাৎ ৭ ই মার্চের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হলো । ব্যাস সম্পূর্ণ ভাষণের মধ্যে বলা সকল কথা তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে থাকলো । খান বাড়ির ছোট ভাই চলে গেল গ্রামের সেন্টারে (রিলিফ কমিটিতে ) । অর্থের কোন কমতি ছিল না তাদের । তারা ধ্বনি তাই তারা বঙ্গবন্ধু একটা কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে পারল । তা হল ,’যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন’ । তাছাড়া গ্রামের খারাপ অবস্থা দেখে তারা সকল গরিব-দুঃখীদেরসহায়তা শুরু করে । রিক্তা , রায়ান এবং কণিকা বলতে থাকে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।’

এরপর আসে পচিশে মার্চ । তাদের গ্রামে কোনো আঘাত না আসলেও পাশের দুটি গ্রামের পরের গ্রাম আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গেছে । যে অর্ধেক মানুষ বেঁচে ছিল তাদের কিছু কিছু মানুষকে খানবাড়ির উদ্যোগে গ্রামের নানান মানুষের বাসায় রাখা হলো । কেউ কেউ খুঁজে পেল আত্মীয়কে ।

এবার শুরু হলো মূল যুদ্ধ । আশে-পাশে পড়ে গেল কান্নার রোল । এপ্রিলের শুরুর দিকে যুদ্ধে প্রশিক্ষণের জন্য ইন্ডিয়ায় যাওয়ার সুযোগ এলো । ঘরের ছোট ভাইকে আর পায় কে! তার নাম সুজন, সুজন চলে গেল ইন্ডিয়ায় । এদিকে কবীর যেতে চাইলেও তাকে যেতে দেওয়া হল না। ঘরের মেজো ছেলে স্বয়ং যেহেতু সরকারি কর্মকর্তা (পুলিশ)বিধায় তাকে যেতেই হলো প্রশিক্ষণে । বড় ভাই সজিব ব্যাংক কর্মকর্তা ও এক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বিধায় সে পরিবার দেখার জন্য রয়ে গেল ।

ধীরে ধীরে যুদ্ধ ক্রমাগত জটিল রূপ নিল।

এপ্রিলের শেষের দিকে কিছু কিছু যোদ্ধা খান বাড়িতে স্থান নিল । তাছাড়া এই পর্যন্ত দুইবার পাকিস্তানি সেনারা খানদের দেখে গেছে ও একবার হুমকি দিয়ে গেছে। রিক্তা একদিন সকলের চোখ এড়িয়ে বাড়ির বাইরে এসে খেলছিল ও বলছিল,’দেশটা হবে স্বাধীন ,জয় বাংলা।’ ব্যাস, পাকিস্থানীদের তা চোখে পড়ে গেলো । দুর্ভাগ্যক্রমে সেদিন হঠাৎ কোনো খবর না জানিয়ে পাকিস্তানিরা গ্রামে প্রবেশ করে । যেই তার দিকে গুলি তাক করে তখন এই আদুরে বাচ্চাকে দেখে তাদের মায়া হয় । পরে আরো একবার হুমকি দেওয়া হয় খানদের ।

রায়ান ,রাকিব, রিক্তা ও কণিকা জানতোই না যে ভাতের ফ্যান কেউ খায় । যখন যোদ্ধারা তা খায় তারা তা অবাক চোখে দেখে ।

মে মাসের শুরুর দিকে । হয়তো কিছুদিন পর সকলকে গ্রাম ছাড়তে হতে পারে । এই সময় টাকা থাকলেও খাবার পাওয়া কঠিন ছিল ।হঠাৎ খবর এসেছে সেন্টারে (কেন্দ্রে) খাবার এসেছে ।

ঘরের দুই ভাইয়ের বউ, নিজের বউ, বাবা-মাকে এবং বাচ্চাদের রেখে সজীব আর গেল না । তাই সেখানে গেল রায়ান, রাকিব ও কবীর । কিছু টাকা দিয়ে তাদের পাঠিয়ে দেয়া হলো সেন্টারে । তারা সেন্টারে গিয়ে দেখে লম্বা লাইন । তারা দাঁড়ায় লাইনে । রায়ান সেন্টারে এক সমবয়সীর সাথে ১০ মিনিটে প্রায় বন্ধুত্ব করে ফেলে । এমন সময় বাহির থেকে বহু লোক সেন্টারে চলে আসে । (সেন্টারগুলো সাধারণতঃ লোকালয় থেকে একটি জলাশয় পর রাখা হতো কারণ এতে পাকিস্তানিরা আক্রমণ করতে পারত না) এবারও একই কাহিনী । পাকিস্তানিরা হামলা করেছে । সকল লোককে সেন্টারে ঢুকিয়ে সেটার বন্ধ করা হলো । রায়ান ছোট তাই ও কিছু বোঝেনা কিন্তু কবীর মনে মনে এবং রাকিব মনে ও বাহিরে অস্থির হয়ে ওঠে । একেকটি গুলির শব্দে তাদের মন কাঁপিয়ে তোলে । তারা তাদের পরিবারের কথা ভেবে প্রায় উন্মাদ হয়ে ওঠে । এবার মাত্র সেন্টারের দরজা খোলা হল । ২জন মুক্তিযোদ্ধা খবর নিতে গেল, যে পাকিস্তানীরা গেছে কিনা । তখন এক প্রকার জোর করেই বের হলো কবীর সাথে কবীরের অনিচ্ছায় রাকিবও গেল । রায়ান কে রাখা হলো তার নতুন বন্ধুর কাছে ।

রাস্তায় যেতে যেতে হঠাৎ আবার গুলির শব্দ । কবীর এমন সময় রাকিবের হাত টেনে চলে গেল এক বাড়ির আড়ালে । তারা দেখে পাকিস্তানিরা মাত্রই একটি বাড়ি থেকে বের হলো । তারা যে বাড়িকে আড়াল হিসেবে নিয়েছিল সেখান থেকেও বেরিয়ে এল দুই জন পাকিস্তানী সৈন্য । সৈন্যরা তাদের দেখামাত্রই গুলি হাতে নিল । কবীর ব্যাপারটি আচ করে ও তার কাছে থাকা গুঁড়ো মরিচ ছিটিয়ে দেয় ওই সৈন্যদের দিকে । কবীর এরকম যুদ্ধের পরিস্থিতিতে সাধারণত বাড়ির বাহিরে গেলে গুঁড়ো মরিচ নিয়ে যায় । এবার সৈন্যরা ঠিক অবস্থায় আসার আগেই তারা পালালো । কিন্তু নদীর কাছে যাওয়ার আগেই রাকিবের পায়ে লাগলো গুলি । অন্য সৈন্যরা ওই দুই সৈন্যের চিৎকার শুনে গুলি করে । রাকিব, যাকে আদরে মানুষ করা হয় ,তার গায়ে গুলি । সে হাঁটতে পারছিল না । পরিশেষে, কবির তাকে নদীর দিকে ধাক্কা দেয় ও একটি কলার কাটা গাছ কে নিয়ে সেও নদীতে ঝাঁপ দেয় । রক্তাক্ত ভাইকে নিয়ে সাঁতরে নদী পার হয় । কিন্তু একটু দেরি করে ওঠে যেন পাকিস্তানিরা চলে যায় । এবার কেন্দ্রে গিয়ে রাকিবের চিকিৎসা করা হলো । সকলে কবীর ও রাকিবকে বকতে শুরু করে । রায়ান রক্ত দেখে ঘাবড়ে যায়। তাই কবির তাকে দূরে নিয়ে যায় । তারা চাচাতো ভাই হলেও নিজের ভাইয়ের মতোই তারা সকলে পরস্পরকে ভালোবাসতো।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কবির ছুটে বাসায় যায় । সেখানে গিয়ে তার চোখের অশ্রু আর ধরে না । তার বাবা-মা , দুই চাচির ও দাদা-দাদির লাশ সামনে । তাদের গণহত্যা করা হয় । কনিকা ও রিক্তার খবর নেই । কবীর কাঁদতে কাঁদতে তার খিচুনি উঠতে ধরে । পরে ও নিজেকে কষ্ট করে সামলায় ও চলে যায় কেন্দ্রে ।
কেন্দ্রে আহত রাকিব যখন জিজ্ঞাসা করল, ‘ কি হয়েছে ?’
তখন কবীরের কান্না আর চোখে ধরে না । তখন রাকিব বলে , ‘কেউ নেই?’
কবীর মাথা নেড়ে না বলে ।
রাকিব এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যায় । ওর জ্ঞান ফিরে আসার পর সে পরিবারকে দেখতে যেতে চায় । সেখানে গিয়ে দুই ভাই নিশ্চুপ হয়ে যায় । রায়ান কে শেষ বারের মত তার মায়ের সাথে ও বাকীদের সাথে দেখা করায় । ছোট হলেও সে যে বোঝে না তা নয় । সে ঠিকই কাঁদে ও মনে মনে কষ্ট পেতে শুরু করে ।

একরাত কেন্দ্রে থাকার পরে পার্শ্বগ্রাম থেকে কবীরের মামা আসে । তাদের পরিবার কে কবর দেওয়া হয় | রাত্রে রাকিব ও কবীর তাদের নিজ বাসায় থাকবে । রায়ান এর জেদে তাকেও নেওয়া হলো । সাথে আছে মামা ।
রাত্রে যখন তারা নির্ঘুম চোখে জেগে ছিল তখন খাটের নিচ থেকে শব্দ আসে, ‘আমি কি আসবো?’ সকালে অবাক হয়ে যায় ও ভয় পায় ।
তবে কবীর বলে ,’কে তুমি ?’
শব্দ আসে ,’আমি রিক্তা ।’
খাটের নিচে থেকে বের হয়ে আসে রিক্তা ।

যখন গণহত্যার জন্য পাকিস্তানিরা বাসায় আসে ,তখনই তাকে খাটের নিচে লুকাতে বলা হয় । পরে সে গুলির শব্দে জ্ঞান হারায় । বিকেলের মধ্যে জ্ঞান ফিরে এলেও কবীর , রাকিব , রায়হান ও মামার ঘরে ঢোকার শব্দে সে আবার লুকিয়ে যায় পাকিস্তানি ভেবে । শেষে সে সবাইকে চিনতে পেরে বের হয় ।

রিক্তাকে দেখে রায়ান , রাকিব , কবীর ও মামা তো খুব খুশি । এমন সময় ওকে বলা হলো কান্তা কোথায় ?
রিক্তা বলে ,’ কান্তাকে আপুকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে । ‘

পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাওয়া যায় কান্তার লাশ । এরপর অনেক দিন কেটে যায় । তাদের হাতে থাকা কিছু টাকা দিয়েই তারা চলতে থাকে । তবে ব্যাঙ্ক এ তাদের সকল টাকা । তাদের চলার জন্য কবীর ও রাকিবের মামার বাসা থেকে অন্যকিছু সহায়তা আসে । আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল না তাদের বরং ঐ শিশুরা আবার সহায়তা করতে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের । অন্যদিকে রাকিব অপেক্ষায় থাকে তার বাবার ও চাচার এবং কবীর তার ২ চাচার ।

দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন ফেরে তাদের ছোট চাচা সুজন । তার ছন্নছাড়া পরিবারের অবস্থা দেখে সেও ভেঙে পড়ে।
রাকিব উত্তেজনা সহকারে বলে , ‘বাবা কেমন আছে?’ , ‘কখন আসবে?’
চাচা খুব সাবধানে তাকে সত্যটা বলে । এতে রাকিব আর নিতে না পেরে কিছুদিন কষ্টে থাকার পর মারা যায় । রিক্তা ও রায়ান এরপর সারাদিন কাঁদে । তাদের বাবা যুদ্ধে মারা গেছে এটা তারা না জানলেও আঁচ করতে পেরেছে । কবীরও অনেকটাই ভেঙে পড়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা স্বাধীনতার সাধে উজ্জীবিত হলেও মনে কোথাও একটা ব্যথা থেকেই যায় তাদের।

ওদের সুজন চাচ্চু এখন জজ । বিয়ে করেছে । কিন্তু তার স্ত্রী অর্থাৎ ওদের চাচি অনেক ভালো । ওদের চাচি ওদের দেখাশোনা করে , ভালোবাসে ও প্রয়োজনে শাসন করে । কিছুদিন পর রায়ান ও রিক্তাকে ওদের চাচ্চু ও চাচি দত্তক নেবে। কবীরকেউ নিতে চাইলে ও বলে,’ জীবনে অনেক আগে এগিয়েছি তোমরা আমার পাশে থাকলেই যথেষ্ট |’

নাম: মোঃ আরিয়ান রশিদ
শ্রেণী: নবম (৯ম)
স্কুল: বগুড়া জিলা স্কুল, বগুড়া
উপজেলা: বগুড়া সদর জেলা: বগুড়া

Leave a Comment