নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এসাইনমেন্ট (১ম এসাইনমেন্ট)

বাংলাদেশের ইতিহাস  গৌরবের ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। ইংরেজ শাসনের রোষানল থেকে মুক্ত হবার পর, আমরা পুনরায় আবদ্ধ হয়ে পড়ি পাকিস্তানি শাসকদের কবলে। দীর্ঘসময় ধারাবাহিক আন্দোলন বহুৎ আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে আমরা ফিরে পায় আমাদের স্বাধীনতা। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মোহনী নেতৃত্ব ও সমগ্র বাঙালি জাতির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। স্বাধীনতা আমার একদিনের বা একটি নির্দিষ্ট কোন কর্মকান্ডের মাধ্যমে পাই নাই। বিভিন্ন সময় নানা ধরনের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করে নিতে হয়েছে। 

 

১৯৫২ সালঃ

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সমগ্র বাংলা জাতির জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ভূমিকা রেখেছে। যার মাধ্যমে বাঙালি জাতি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে শিখেছে। 

 

১৯৬৬ সালঃ 

১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবি ঘোষণার মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান আইয়ুব খানের  রক্তচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে নিজেদের ন্যায্য দাবি সম্পর্কে বাঙালি জাতিকে সচেতন করেছে।

 

১৯৭০ সালঃ

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ সমগ্র বাঙালি জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে। 

 

আমার মনে হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে অধিকতর প্রেরণা যুগিয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলন ছিল আমাদের প্রতি প্রথম প্রতিবাদ এবং আমরা এই আন্দোলনের সফলতা অর্জন করি। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে বাধ্য হয়। যা ছিল আমাদের প্রথম আন্দোলন এবং আন্দোলনের সফলতা আমাদের স্বাধীনতার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। 

 

পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি পূর্বেই এই রাষ্ট্রের ভাষা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মনে করে তাদের পছন্দ অনুযায়ী ভাষা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে আমাদের উপর আধিপত্য বাদ প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু বাঙালি জনগণ তা মেনে নেয়নি। করেছে তীব্র প্রতিবাদ ও রক্ত দিয়েছে যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ও বিরল। ১৯৪৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কালামের নেতৃত্বে “তমদ্দুন মজলিশ” গড়ে উঠলে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানালে প্রতিবাদ গড়ে ওঠে “রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ” যা  বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করেছিল।

 

১৯৪৮ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের গণপরিষদে উর্দু ও  ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে অধিকার আদায়ের জন্য আমরা বদ্ধপরিকর তা বুঝিয়ে আসতে সক্ষম হন।

 

পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসবে এ কারণে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ৮ দফা দাবি মেনে নেন।  ১৯৪৮ সালের ১৯ শে মার্চ জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ প্রদান করেন। ২৪শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ প্রদান কালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানালে ছাত্র “না না” বলে তীব্র প্রতিবাদ করে।

 

১৯৫২ সালের ২৬ শে জানুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টনে এক জনসভায় জিন্নাহর অনুকরণে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। 

 

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ শে জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করা হয় এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দুবার আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। 

 

২০শে ফেব্রুয়ারি সরকার তার এক ঘোষণায় ২১শে ফেব্রুয়ারী  থেকে দেশের সর্বত্র ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। সভা, সমাবেশ, মিছিল এক মাসের জন্য দেশের সর্বত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি ১০ জন করে মিছিল বের করেন।

 

পুলিশ মিছিলে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলি নিক্ষেপ করলে আবুল বরকত, জব্বার, রফিক সহ আরো অনেক শহীদ হন। ২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শোক র‌্যালি হলে সেখানে পুলিশের হামলায় শফিউর রহমান নিহত হন। 

 

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হত্যাযজ্ঞ বাঙালিকে আরো প্রতিবাদ মুখর করে তোলে। 

 

১৯৪৭ সালের সংঘঠিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সালে ধীরে ধীরে জোড়ালো প্রতিবাদ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের রূপলাভ করে। যার ফলাফল স্বরূপ পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেয়।

 

স্বাধীনতা আন্দোলনের জয়লাভ একক কোন ঘটনার পর প্রকাশ নয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ ২৪ বছরের গঠনতান্ত্রিক আন্দোলন, ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে জয়লাভ, ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ৬ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে জয়লাভ এবং জয় লাভের ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ বাঙ্গালীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।

 

তবে আমি মনে করি ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং এ আন্দোলনের সফলতা অর্জন আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। বাঙালি জাতি বুঝতে পেরেছিল ন্যায্য দাবী নিয়ে অগ্রসর হলে সফলতা আসবেই। তাই প্রত্যেকটি ঘটনার মধ্যে স্বাধীনতা অর্জনে ভাষা আন্দোলনকে আমার বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

Leave a Comment