মানবধর্ম কবিতার গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

মানবধর্ম কবিতার সরল (গদ্য) অনুবাদঃ

সব লােকে সংসারে লালনের জাত – পরিচয় জানতে চায় ।

লালন বলেন, আমার নজরে জাতের রূপ দেখলাম না।

কেউ মালা, কেউ তসবি গলায়, তাই বলে তাে ভিন্ন জাত বলা যায় না।

মৃত্যু বা জন্মের সময় কারাে জাতের চিহ্ন থাকে না।

গর্তের জলকে কুপজল কয়, 

গঙ্গায় গেলে সে জল গঙ্গাজল হয় , 

মূলত সব জলই এক, ভিন্ন জল নয় ,

পাত্র ভিন্ন হলে জলের পরিচয়ও বদলে যায়।

জগৎ জুড়ে মানুষ জাতের কথা বলে,

যেখানে সেখানে মানুষ জাতের গৌরব করে,

লালন সে জাতের চিহ্নকে সাত বাজারে বিক্রি করেছেন।

 

মানবধর্ম কবিতার পাঠ বিশ্লেষনঃ

 

সব লােকে কয় লালন কী জাত সংসারে। 

মানুষ লালনকে তাঁর জাত-পাত সম্পর্কে প্রশ্ন করে জানতে চায়। তারা জানতে চায় তিনি কোন্ ধর্মের লােক বা তাঁর পরিচয়ই বা কী ? এটা মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা সে অন্যের জাত , ধর্ম ইত্যাদি পরিচয় জানতে চায়।

 

লালন কয়, জেতের কী রূপ, দেখলাম না এ নজরে । 

মানুষের জিজ্ঞাসার উত্তরে লালন বলেন , তিনি তাঁর নজর বা দৃষ্টি শক্তি দিয়ে বিচার করে জেতের তথা জাতের পরিচয় জানতে সক্ষম হননি। তিনি এ কথা দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন তাঁর কাছে সব মানুষ একই মনে হয়েছে। জাত কীভাবে মানুষকে আলাদা করে তা তিনি বুঝতে পারেননি।

 

কেউ মালা , কেউ তসবি গলায় , 

তাইতে কী জাত ভিন্ন বেলায়।

কবি লালন শাহ এখানে বলতে চেয়েছেন, আমরা কিছু বাইরের বৈশিষ্ট্য বা চিহ্ন দিয়ে জাত বিচার করি। যেমন: হিন্দু ঋষি, সন্ন্যাসিরা গলায় বুদ্রাক্ষের মালা পরেন, আবার মুসলমান মৌলবি বা মাওলানার গলায় থাকে তসবি। এসবই বাইরের দিক। এসব দিয়ে জাতবিচার অনেক সময় সঠিক হয় না। 

 

যাওয়া কিংবা আসার বেলায়

জেতের চিহ্ন রয় কার রে।

সব জাত ও ধর্মের মানুষই জন্মের সময় একইভাবে পৃথিবীতে আসে। সদ্যোজাত মানবসন্তানের গায়ে আলাদা কোনাে জাতের চিহ্ন থাকে না। তেমনি মৃত্যুর পর মানবদেহ যখন ধুলায় পরিণত হয়, তখন তাও কোনাে জাতের চিহ্ন বহন করে না।একটা নতুন জন্ম নেওয়া শিশু এবং মৃত কঙ্কাল দেখে তার জাত পরিচয় শনাক্ত করা যায় না।

 

গর্তে গেলে কুপজল কয় ,

গঙ্গায় গেলে গঙ্গাজল হয়।

একই জল যখন গর্তের মধ্যে থাকে তখন তাকে আমরা কুয়ার জল বলি। আবার সেই জল গঙ্গায় প্রবাহিত হলে তাকে গঙ্গাজল বলি। হিন্দুদের কাছে গঙ্গা নদীর পানি পবিত্রতার প্রতীক।

 

মুলে এক জল, সে যে ভিন্ন নয়,

ভিন্ন জানায় পাত্র অনুসারে।

কবি বুঝাতে চেয়েছেন সব জলই এক। ভিন্ন পাত্রে রাখলে তার ভিন্ন পরিচয় হয়। সাধারন গর্ত বা কুয়ার মধ্যে থাকলে তার এক রকম পরিচয়, আবার সেইমএকই জল যদি গঙ্গার মতাে পবিত্র নদীতে থাকে তবে তার আরেক ধরনের পরিচয়। তেমনি মানুষও সব একই রকমের। এক এক জাতে জন্ম নিয়ে ভিন্ন পরিচয় পায়।

 

জগৎ বেড়ে জেতের কথা,

লােকে গৌরব করে যথা-তথা।

পৃথিবীতে মানুষের কাছে তার জাতের পরিচয়টাই বড়। তারা জাত পাত বা বংশ নিয়ে এখানে সেখানে গৌরব করে বেড়ায়। অথচ তা ঠিক নয়। কারণ জাত-পাতই মানুষের মূল পরিচয় নয়।

 

লালন সে জেতের ফাতা

বিকিয়েছে সাত বাজারে।

লালন জাতের পরিচয়ে বিশ্বাস করেন না। তিনি জেতের ফাতা অর্থাৎ জাতের নিশান বা চিহ্ন অনেক আগেই সাত বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। এখানে সাত বাজারে বিক্রি করে দেওয়াকে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। কোনাে কিছু বিক্রি করে দিলে নিজের কাছে আর তার অস্তিত্ব থাকে না।

 

মানবধর্ম কবিতার বস্তুসংক্ষেপঃ

সব লােকে কয় লালন কী জাত সংসারে গানটি ‘মানবধর্ম’ কবিতা হিসেবে পাঠ্য বইয়ে সংকলিত হয়েছে। এ কবিতায় লালন ফকির মানুষের জাত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। নিজে কোন ধর্মের বা জাতের, এমন প্রশ্ন লালন সম্পর্কে আগেও ছিল এখনও আছে। 

লালন বলেছেন, জাতকে তিনি গুরুত্বপুর্ণ মনে করেন না। মনুষ্যধর্মই মূলকথা। জন্মমৃত্যু কালে কি কোনাে মানুষ তসবিহ বা জপমালা ধারন করে থাকে ? সে সময় সবাই সমান থাকে। কখনই চেনা যায় না সে কোন জাতের বা ধর্মের । মানুষ জাত ও ধর্ম ভেদে যে ভিন্নতার কথা বলে লালন তা বিশ্বাস করেন না । লালনের মতে , মানবধর্ম তথা মনুষ্যত্ববােধই মানুষের প্রকৃত পরিচয় । তাই জাতপাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয় ।

 

মানবধর্ম কবিতাটির পাঠের উদ্দেশ্যঃ

এই পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে সক্ষম হবে যে, ধর্ম বা সম্প্রদায়গত পরিচিতির চেয়ে মানুষ হিসেবে পরিচয়টাই বড়। তার জাত পাত বা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি বা মিথ্যে গর্ব করা থেকে বিরত হবে ।

 

মানবধর্ম কবিতার গুরুত্বপুর্ন তত্ত্ব কণিকাঃ-

* সব লােকে কয় লালন কী জাত সংসারে লালন ফকিরের গান।

* ‘মানবধর্ম’ কবিতাটি মূলত – গান ।

* মানবধর্ম কবিতায় কবি – জাত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।

* লালনের ধর্ম নিয়ে সকলের মনে – প্রশ্ন আছে।

* লালন গুরুত্বপুর্ন মনে করেন না – জাতকে।

* লালন গুরুত্বপুর্ন মনে করেন – মানবধর্ম বা মানবতাকে।

* লালন বিশ্বাস করেন না – মানুষের জাত ও ধর্মভেদকে।

* লালনের মতে, মনুষ্যধর্মই হলাে – মূলকথা।

* মানুষ তসবি বা জপমালা ধারন করে না – জন্ম ও মৃত্যু সময় ।

* জন্ম ও মৃত্যুর সময় সকলেই – সমান।

* জাত ও ধর্মের ভিন্নতা নিয়ে সকলেই – কথা বলে ।

* ধর্ম ও জাত নিয়ে লালনের মনে – কোনাে বিশ্বাস নেই।

* ‘জেতের’ শব্দের অর্থ – জাতের।

* জাত বলতে বােঝানাে হয়েছে – জাতি বা ধর্মকে।

* কুপে যে জল থাকে তাকে বলে – কুপজল।।

* গঙ্গাজল বলতে বােঝায় – গঙ্গা নদীর জল ।

* হিন্দুদের কাছে পবিত্রতার প্রতীক – গঙ্গাজল।

* জেতের ফাতা বলতে বােঝানাে হয়েছে – ধর্মের বৈশিষ্ট্যকে।

* ফাতা বলতে বােঝায় – নিশান ।

* সব লােকে কয় – লালন কী জাত সংসারে।

* লালন কখনও দেখেনি – জেতের রুপ।

* মালা ও তসবি জানায় — জাতের ভিন্নতা

* যাওয়া আসার বেলায় থাকে না – জাতের চিহ্ন ।

* জল গর্তে গেলে বলা হয় – কুপ জল ।

* সব জলই মূলে – এক জল।

* জলের ভিন্নতা প্রকাশ পায় – পাত্রের কারনে।

* জগৎ জুড়ে রয়েছে – জাতের কথা ।

* জাতের কথা নিয়ে লােকজন – গৌরব করে যথা তথা।

* লালন শাহ – মানবতাবাদী মরমি কবি ।

* লালন জাতভেদকে ক্ষতিকর বলেছেন – মানবতার জন্য।

* লালনের মতে আমাদের বিরত থাকতে হবে- জাত-পাত বা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ও মিথ্যা গর্ব করা থেকে ।

* লালন শাহের গানের বৈশিষ্ট্য – আধ্যাত্ম ভাব ও মরমি রসব্যঞ্জনা ।

* লালন শাহ – সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন।

 

মানবধর্ম কবিতার কবি পরিচিতিঃ

* লালন শাহ মানবতাবাদী মরমি কবি ।

* সাধক সিরাজ সাঁই বা সিরাজ শাহর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর তিনি লালন শাহ্ নামে পরিচিতি অর্জন করেন।

* গানে তিনি নিজেকে ফকির লালন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

* প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালাভ না করলেও নিজের চিন্তা ও সাধনায় তিনি হিন্দু ও মুসলমান ধর্ম শাস্ত্র সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন।

* ধর্মীয় জ্ঞানের সংগে নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্দির মিলনে তিনি নতুন এক দর্শন প্রচার করেন ।

* গানের মধ্য দিয়ে তাঁর দর্শন প্রকাশিত হয়েছে।

* আধ্যাত্মভাব ও মরমি রসব্যঞ্জনা তাঁর গানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

* তিনি সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন।

* লালন শাহ ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে ঝিনাইদহ, মতান্তরে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহন করেন। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়ার দেউরিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়।

 

মানবধর্ম কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন-০১। ‘জেতের ফাতা’ অর্থ কী ?

উত্তরঃ ‘জেতের ফাতা’ অর্থ জাত বা ধর্মের বৈশিষ্ট্য।

প্রশ্ন-০২। লালন শাহের গুরু কে ছিলেন ?

উত্তরঃ লালন শাহের গুরু ছিলেন সাধক সিরাজ সাঁই ।

প্রশ্ন-০৩। কুপজল ও গঙ্গাজলকে কখন ভিন্ন বলা যায়?

উত্তরঃ ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে রাখলে কুপজল ও গঙ্গাজলকে ভিন্ন বলা যায় ।

প্রশ্ন-০৪। লালন শাহের জন্য কত সালে?

উত্তরঃ লালন শাহের জন্য ১৭৭২ সালে।

প্রশ্ন-০৫। লালনশাহ কী ধরনের মরমি কবি ?

উত্তরঃ লালন শাহ মানবতাবাদী মরমি কবি ।

প্রশ্ন-০৬। লালন শাহের গানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কী ?

উত্তরঃ অধ্যাত্মবাদ ও মরমি রসব্যঞ্জনা লালন শাহের গানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

প্রশ্ন-০৭। লালন শাহ কার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ?

উত্তরঃ লালন শাহ সাধক সিরাজ সাঁই বা সিরাজ শহর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

প্রশ্ন-০৮। লালন শাহ কত সালে মৃত্যুবরণ করেন ?

উত্তরঃ লালন শাহ ১৮৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

প্রশ্ন-০৯। মানবধর্ম’ কবিতাটি আসলে কী ?

উত্তরঃ মানবধর্ম কবিতাটি আসলে লালন শাহের একটি বিখ্যাত গান।

প্রশ্ন-১০। গানের মধ্যে দিয়ে লালন শাহের কোন দর্শন প্রকাশ পেয়েছে ?

উত্তরঃ গানের মধ্য দিয়ে লালন শাহের মানবতাবাদী দর্শন প্রকাশ পেয়েছে।

প্রশ্ন-১১। লালন শাহ গানের মধ্যে নিজেকে কী বলে পরিচয় দিতেন ?

উত্তরঃ লাল লাহ নিজেকে গানের মধ্যে ফকির হিসেবে পরিচয় দিতেন।

প্রশ্ন-১২। ‘মানবধর্ম’ কবিতায় লালন শাহ কী দিয়ে উত্থাপন করেছেন ?

উত্তরঃ ‘মানবধর্ম’ কবিতায় লালন শাহ মানুষের জাত-পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।

প্রশ্ন-১৩। লালন শাহ ধর্মীয় শাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন কীভাবে ?

উত্তরঃ লালন শাহ নিজের চিন্তা ও সাধনার দ্বারা ধর্মীয় শাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন।

প্রশ্ন-১৪। লালন কী বিশ্বাস করে না ?

উত্তরঃ লালন ধর্মভেদে মানুষের ভিন্নতা ।

প্রশ্ন-১৫। লালনের মতে কখন সবাই সমান ?

উত্তরঃ জন্ম ও মৃত্যুকালে

 

মানবধর্ম কবিতার অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন-০১। মূলে একজল, সে যে ভিন্ন নয়’-বলতে কী বােঝায় ?

উত্তরঃ মূলে এক জল, সে যে ভিন্ন নয়’-বলতে কবি জগৎ জুড়ে থাকা মানুষের অভিন্নতাকে বােঝাতে চেয়েছেন।

কবি জগতের মানুষের কাছে নানা রকম সহজ ও সাধারণ বিষয় উপমার মাধ্যমে মানবতার বাণীকে মূর্ত করে তুলেছেন। তিনি জলের উপমা দিয়ে মানুষে মানুষে অভিন্নতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি দেখান যে, জলের বিশেষ কোন নাম নেই, পাত্র অনুসারে তার নামকরণ করা হয়। গর্তে থাকা জলকে আমরা কূপজল বলি, আবার এ জল যখন গঙ্গায় যায় তখন তা গঙ্গাজল নাম ধারণ করে। এখানে জলের নামের যে সম্পর্ক তা পাত্রের সাথে সম্পর্কিত,জলের সাথে নয় । এভাবে তিনি মানুষকে বােঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষ জলের মতাে অভিন্ন সত্তার অধিকারী। কূপ ও গঙ্গা এখানে বিশেষ অর্থে মানুষের তৈরি মিথ্যা, জাত, ধর্ম, বর্ণ ইত্যাদি বিষয়কে নির্দেশ করেছে। মূলত অভিন্ন মানবসত্তাকে তুলে ধরতে কবি প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।

 

প্রশ্ন-০২। কূপজল ও গঙ্গাজল কীভাবে অভিন্ন সত্তা ? বুঝিয়ে লেখ।

উত্তরঃ কূপজল ও গঙ্গাজল অভিন্ন সত্তা, কারণ সব জলের ধর্ম এক ও অভিন্ন। 

জলের নিজের কোনাে ভিন্নতা নেই। সেটা গঙ্গার জলই হােক, আর কুয়াের জলই হােক-জল জলই । স্থান-পাত্রের ভিন্নতা হয়, জলের ভিন্নতা হয় না। জলের সাধারণ ধর্মের পরিবর্তন ঘটে না। যেখানে জল থাকে তার ভিন্ন ভিন্ন নাম থাকতে পারে। যেমন-কুয়াের জল, পুকুরের জল, কলসির জল , গ্লাসের জল । এভাবে ধারকের বা পাত্রের ভিন্নতার জন্য জলের ভিন্নতা হতে পারে না। তাই বলা যায় যে, কূপজল ও গঙ্গাজল অভিন্ন সত্তা।

 

প্রশ্ন-০৩। ‘মানবধর্ম’ কবিতায় মানবজাতিকে কীভাবে অভিন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয় ?

উত্তরঃ ‘মানবধর্ম’ কবিতায় মানৰ্কিতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় মানবজাতিকে অভিন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

‘মানবধর্ম’ কবিতায় লালন ফকির মানুষের জাত-পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি জাত-ধর্মকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। তার কাছে মনুষ্যধর্মই মূল কথা। মানুষ জাত ও ধর্মভেদে যে ভিন্নতার কথা বলে তা লালন বিশ্বাস করেন। ‘মানবধর্মী’ কবিতায় তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনায় মানবজাতিকে অভিন্ন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

 

প্রশ্ন-০৪। ‘মানবধর্ম’ কবিতায় জেতের ফাতা’ বলতে কী বােঝানাে হয়েছে ?

উত্তরঃ ‘মানবধর্ম’ কবিতায় ‘জেতের ফাতা’ বলতে জাতের ধর্ম বা ধর্মের বৈশিষ্ট্য বোঝানাে হয়েছে।

লালন শাহ মানবতাবাদী কবি। মানবধর্ম’ কবিতায় তিনি প্রকাশ করেছেন মনুষ্যধর্মই মূলকথা। সব মানুষই সমান। জগজুড়ে মানুষ জাত-পাতের কথা বলে যে গৌরব প্রদর্শন করে কবিতা মানেন না। তাঁর কাছে জাত বা ধর্মের নির্দিষ্ট কোনাে বৈশিষ্ট্য নেই। সব ধর্মই তাঁর কাছে সমান। তিনি সব ধর্মের থেকে মানবধর্মকে বড় করে দেখেছেন। তাই তিনি ‘জেতের ফাতা’ সাত বাজারে বিকিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ ধর্মে ধর্মে যে বিভেদ বৈষম্যতা তিনি বিশ্বাস করেন না।

 

প্রশ্ন-০৫। ‘মূলে এক জল’ বলতে কী বােঝানাে হয়েছে ?

উত্তরঃ ‘মূলে এক জল’-এর মানে হচ্ছে সৃষ্টির এক রহস্য এবং স্রষ্টার কাছে মানুষের জাতিভেদ না থাকা।

লালন মাহ মানবধর্মের প্রচারক। তিনি নিজেকে জানার মধ্য দিয়ে স্রষ্টাক জানার সাধনায় মগ্ন ছিলেন। তাঁর সাধনজ্ঞানের আলােকে তিনি মানব জন্মরহস্য এবং স্রষ্টার দিক থেকে অভিন্নতার দিকটিকে নির্দেশ করেছেন। তার মতে হিন্দুর ভগবান, খ্রিষ্টানের ঈশ্বর বলতে আলাদা কিছু নেই। সবের মূলে মানুষ এক এবং তার স্রষ্টা একজন। এই বিষয়টিকে তিনি পাত্রানুসারে জলের নামকরণের সাথে তুলনা করেছেন। এখানে পাত্র সত্য নয়, জল সত্য।

 

প্রশ্ন-০৬। কবি মানুষে জাতি-ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন কেন ?

উত্তরঃ জাত-পাত বা ধর্ম মানুষের আসল পরিচয় নয়। তাই কবি মানুষকে জাতি-ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।

পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করে। তাদের সবার পরিচয় মানুষ। কারণ জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ গােত্র ইত্যাদি মানুষের প্রকৃত পরিচয় নয়। মনুষ্যধর্মই মানুষের প্রকৃত পরিচয়। পৃথিবীতে সব মানুষই একই রকম রক্ত-মাংসে গড়া। তাই কবি মানুষকে জাতি-ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।

 

প্রশ্ন-০৭। জাতপাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয় কেন?

উত্তরঃ জাতপাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়, কারণ জাতপাত মানুষের আসল পরিচয় নয়।

পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করে, তাদের সবারই পরিচয় এক, আর সেই পরিচয়টি হলাে সে মানুষ। কারণ জাতপাত, বর্ণ, গােত্র ইত্যাদি মানুষের প্রকৃত পরিচয় নয়। মানুষের মধ্যে মনুষ্যধর্ম থাকলেই সে মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়। ধর্মীয় বা অন্য কোনাে বিষয় সেখানে অর্থহীন। এ পৃথিবীতে সব মানুষ যেহেতু একই রক্ত-মাংসে গড়া, তাই জাত পাত নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়।

 

প্রশ্ন-০৮। লালন মানুষের ধর্ম অভিন্ন মনে করেছেন কেন ?

উত্তরঃ অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনায় বিশ্বাসী বলে লালন শাহ মানুষের ধর্ম অভিন্ন মনে করেছেন।

লালন শাহ মানবতাবাদী ও মরমি কবি। গানে তিনি নিজেকে ফকির লালন হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা লাভ না করলেও নিজের চিন্তা ও সাধনায় তিনি হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় শাস্ত্র সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি মানুষের জাতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। মনুষ্যধর্মই তার কাছে মূল কথা। তাই মানুষ জাত ও ধর্মভেদে যে ভিন্নতার কথা বলে তা তিনি বিশ্বাস করেন না।

 

প্রশ্ন-০৯। “ভিন্ন জানায় পাত্র-অনুসারে।”-কীভাবে ? ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ “ভিন্ন জানায় পাত্র-অনুসারে” বলতে জলের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান অনুসারে নামকরণের মতাে মানুষের জাতিভেদে নামকরণ এবং স্রষ্টার নামের পার্থক্যকে বুঝানাে হয়েছে।

লালন শাহ মানবতাবাদী মরমি সাধক। তিনি নিজেকে জানার ও বুঝার মধ্য দিয়ে প্রষ্টাকে জানতে চেয়েছেন। তাঁর ধর্ম-মানবধর্ম । তার কাছে মুসলমানের আল্লাহ, হিন্দুর ভগবান, খ্রিষ্টানের ঈশ্বর বলতে আলাদা আলাদা কোনােকিছুই নেই। এই বিষয়টিকে তিনি পাত্রানুসারে জলের নামকরণের সাথে তুলনা করেছেন। এখানে পাত্র সত্য নয়, জল সত্য। জল গর্তে গেলে কপজল আর গঙ্গায় গেলে গঙ্গা জল নাম ধারণ করে। আসলে জল কিন্তু একই বস্তু। তেমনি ধর্ম যা-ই-হােক, তার মূল পরিচয় মানুষ ।

 

প্রশ্ন-১০। ধর্ম নিয়ে মিথ্যা বাড়াবাড়ি করা উচিত নয় কেন?

উত্তরঃ ধর্ম নিয়ে মিথ্যা বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। কারণ ধর্ম মানুষের জন্য,মানুষ ধর্মের জন্য নয়। তাই ধর্ম নিয়ে মানুষকে পার্থক্য করা সমাচীন নয় ।

‘মানবধর্ম’ কবিতায় কবি ও সাধক লালন শাহ পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের, বর্ণের, জাতের যে মানুষ আছে তাদের সবাইকে এক ধর্ম তথা মানবধর্মের মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, স্রষ্টা কাউকে পার্থক্য করে জন্মগ্রহণ করান এবং মৃত্যুও দেন না। সবার জন্ম ও মৃত্যু রহস্য একই রকম। কাজেই জাতি-ধর্মের যে পার্থক্য তা মানুষের তৈরি। তাই ধর্ম নিয়ে মিথ্যা বাড়াবাড়ি করা উচিত নয় ।

 

প্রশ্ন-১১। ‘কেউ মালা, কেউ তসবি গলায়’বলতে কী বােঝানাে হয়েছে ?

উত্তরঃ এখানে কেউ মালা, কেউ তসবি গলায় বলতে হিন্দু-মুসলমানকে নির্দেশ করা হয়েছে।

সমাজে জাতভেদের প্রথাটা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। মানুষকে নানা জাতে বিভক্ত করা হয়েছে- হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ইত্যাদি। এই জাতের চিহ্নস্বরূপ কেউ গলায় মালা পরে আবার কেউ তসবি পরে।

 

প্রশ্ন-১২। লালন জেতের ফাতা সাত বাজারে বিকিয়েছেন কেন ?

উত্তরঃ জাত-পাত বা ধর্ম বর্ণ পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে না করায় লাল জাতের ফাতা সাত বাজারে বিকিয়েছেন।

জন্মসূত্রে লব্ধ জাত-পাত বা ধর্ম-বর্ণ পরিচয়কে লালন শাহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করেননি। তার মতে মনুষ্যধর্মই মূলকথা। জন্ম-মৃত্যুকালে কি কোনাে মানুষ তসবি বা জপমালা ধারণ করে থাকে ? মানুষ জাত ও ধর্মভেদে যে ভিন্নতার কথা বলে লালন তা বিশ্বাস করেননি বলে বলেছেন, জাতের ফাতা তিনি সাত বাজারে বিকিয়েছেন ।

 

প্রশ্ন-১৩। লালন শাহ জাতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না কেন ? ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ পৃথিবীর সব মানুষ এক জাতি-মরমি সাধক মানবতাবাদী লালন শাহ এ বিশ্বাসে বলীয়ান ।

ফকির লালন শাহ’র কাছে মানুষের বড় পরিচয় এক জাতি হিসেবে। জাত-ধর্ম দিয়ে মানুষের বিচার তার কাছে মূল্যহীন। তিনি যুক্তিনিষ্ঠভাবে জাত-ধর্মের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন তসবি আর মালা পরে হিন্দু-মুসলিম পার্থক্য করা, টুপি আর টিকি দেখে তাদের চিহ্নিত করার পেছনে যুক্তি থাকতে পারে, খবু বেশি বাড়াবাড়িতে সুন্নত দিলে মুসিলম পুরুষ হয়তাে চেনা যায়, কিন্তু নারী লােকের ক্ষেত্রে এ বিধান খাটে না। এ কারণে তিনি মানুষকে অভিন্ন জাতধর্মের মানদন্ডে বিচার করেন।

 

প্রশ্ন-১৪। “মনুষ্যধর্মই মূলকথা”-লালনের এ দর্শনটি ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ লালন শাহ মানবধর্মের প্রচারক। মানবধর্ম সম্পর্কে তাঁর দর্শন হচ্ছে মানুষের ভিন্ন কোনাে ধর্ম নেই, সে মানুষ এটাই তার বড় ধর্ম। 

ধর্ম মানুষের জীবনবােধ ও জীবনাচরণের উন্নতির ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে একথা সত্য। কিন্তু তা যদি মানুষে মানুষে পার্থক্য সৃষ্টি করে, সম্পদ্রায়গত হিংসা ও হানাহানির জন্ম দেয়, তাহলে গ্রহণযােগ্যতা হারায়। আর যদি এক স্রষ্টার সৃষ্টি এক চন্দ্র-সূর্যের আলােয় লালিত, এক আকাশের নিচে এক পৃথিবীর বাসিন্দা ভাবা যায়, তাহলে মানবধর্মের মূলে পৌছা যায়। সেখানে মনুষ্যধৰ্মই বড় হয়ে ওঠে, পার্থক্য থাকে না।

 

প্রশ্ন-১৫। মানবধর্ম’ কবিতায় দর্শ বা সম্প্রদায়গত পরিচিতির গুরুত্ব কতটুকু ? ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ মানবধর্ম’ কবিতাটি মরমি সাধক লালন শাহর একটি বিখ্যাত গান। এতে তিনি জাত-ধর্মের হীন ধারণাকে ভেঙে নতুন বােধ বিবেচনার জন্ম দিতে প্রয়াস দিয়েছেন।

‘মানবধর্ম’ কবিতায় ধর্ম বা সম্প্রদায়গত পরিচিতির গুরুত্ব একেবারেই নেই। এখানে উঁচু, নিচু, ছাে-বড়, জাত-ধর্ম, সম্প্রদায়কে পেছনে ফেলে মানবতার জয়গান করা হয়েছে। লালনের কাছে পৃথিবীর সকল ধর্মের সম্মিলিত রূপ হচ্ছে মানবধর্ম । আর মানবতার কল্যাণে আত্মনিবেদনই পরম ও চরম কাজ।

Leave a Comment