বাংলা নববর্ষ প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও অনুধাবনমূলক প্রশ্ন

পাঠের উদ্দেশ্যঃ

এই পাঠের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপুর্ন উৎসব সম্পর্কে সম্যক ধারনা পাবে।

এছাড়া তারা পাহাড়িদের বর্ষবরন অনুষ্ঠান সম্পর্কেও জানবে। একটি সাংস্কৃতিক আয়ােজন কীভাবে বাঙালির রাজনৈতিক ঘটনাকে প্রভাবিত করেছে শিক্ষার্থীরা তাও অবগত হবে।

 

পাঠ পরিচিতি/ বস্তুসংক্ষেপঃ

বাংলা নববর্ষ বাঙালির খুবই গুরুত্বপুর্ন উৎসব। আজকের বাংলাদেশ যে স্বাধীন হতে পেরেছে, তার পেছনে নববর্ষের প্রেরনাও সক্রিয় ছিল। 

কারণ পাকিস্তানিরা বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ উদ্যাপনে বাধা দিয়েছিল এবং এর প্রতিবাদে বাঙালিরা রুখে দাঁড়িয়েছিল। বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের সংগে সাংস্কৃতিক ইতিহাস, বিশেষ করে নববর্ষ উদ্যাপনের ইতিকথা মিশে আছে।

আজও নববর্ষে মঙ্গল শােভাযাত্রা বের করা হয়। নববর্ষের উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলা সন কে, কবে প্রচলন করেছিলেন এ নিয়ে মতান্তর থাকলেও ধরে নেওয়া হয় সম্রাট আকবরের সময় এ সনের গণনা আরম্ভ হয় । পরে জমিদার ও নবাবেরা নববর্ষে পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়ােজন করতেন। নববর্ষে হালখাতা, বৈশাখী মেলা, ঘোড়দৌড়,বিভিন্ন লােকমেলার আয়ােজন করে সাধারন মানুষ এ উৎসবকে প্রাণে ধারণ করেছে। বাঙালি গৃহিণীরাও আমানিসহ নানা ব্রত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বছরের প্রথম দিনটি উদ্যাপন করে থাকে। 

পাহাড়ি অবাঙালি জনগােষ্ঠিও বৈসাবি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের মতাে করে তারা নববর্ষ উদ্যাপন করে। সূচনার পর থেকে এই নববর্ষ পালনে নানা মাত্রা সংযােজিত হয়েছে। তবে এ উৎসবকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করায় সে আয়ােজন দেশময় ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলনের পর থেকে আমরাও নববর্ষ উত্সব ব্যাপকভাবে পালন আরম্ভ করি এবং এখন এই উৎসব বাঙালির জীবনে এক গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে ।

 

লেখক পরিচিতিঃ

* জন্ম – শামসুজ্জামান খান ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার চারিগ্রামে জন্মগ্রহন করেন।

* ২০০৯ সালের মে মাসে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে যােগদান করেন।

* শামসুজ্জামান খান খ্যাতি অর্জন করেন – লেখক, গবেষক, ফোকলোরবিদ হিসেবে।

* প্রবন্ধ গ্রন্থ – নানা প্রসঙ্গ, গণসংগীত , মাটি থেকে মহীরুহ, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ ও প্রাসঙ্গিক কথকতা, মুক্তবুদ্ধি , ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমকাল, আধুনিক ফোকলাের চিন্তা, ফোকলােরচর্চা।

* রম্য রচনা – ঢাকাই রঙ্গরসিকতা, গ্রাম বাংলার রঙ্গরসিকতা।

* শিশুসাহিত্য – দুনিয়া মাতানাে বিশ্বকাপ, লােভী ব্রাক্ষ্মণ ও তেনালীরাম , ছােটদের অভিধান।

 

গুরুত্বপুর্ন তত্ত্বঃ

*সন কথাটি – আরবি ভাষার , সাল কথাটি – ফারসি।

* ইলাহি সন প্রবর্তন করেন – সম্রাট আকবর।

* সনের পরিবর্তে অনেকে ব্যবহার করেন – বঙ্গাব্দ ।

* নবাব ও জমিদারেরা চালু করেন – পুণ্যাহ অনুষ্ঠান।

* পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল – খাজনা আদায় করা।

* নববর্ষ সকল দেশের , সকল জাতির – আনন্দের দিন।

* নববর্ষ পালন করা হয় – সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যানের প্রত্যাশা নিয়ে।

* বাংলাদেশের প্রধান জাতীয় উৎসব – নববর্ষ।

* পাকিস্তান আমলে নববর্ষ উদ্যাপনে বাধা দেওয়ার কারণ – পাকিস্তানি আদর্শের পরিপন্থি।

* যুক্তফ্রন্ট মুসলিম লীগকে নির্বাচনে পরাজিত করে – ১৯৫৪ সালে ।

* বাংলা নববর্ষকে সরকারি ছুটির দিন ঘােষনা করেন – শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।

* পয়লা বৈশাখের/ বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় বৃহৎ, অনুষ্ঠান – হালখাতা।

* নববর্ষের প্রাচীন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান হলাে – আমানি।

* আধুনিক আঙ্গিকে নববর্ষবরণ উদ্যাপন শুরু হয় – কলকাতার ঠাকুর পরিবার এবং শান্তিনিকেতনে।

* নববর্ষ উৎসব নতুন গুরুত্ব ও তাৎপর্য লাভ করে – ভাষা আন্দোলনের পর।

* ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মােট ২৬ বছর সময়কে বলা হয় – পাকিস্তান শাসনামল।

* বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান – ছায়ানট।

* মানুষের মঙ্গল কামনা করে যে শােভাযাত্রা – মঙ্গল শােভাযাত্রা।

* যা পুর্বে ছিল এবং এখনও বর্তমান – আবহমান।

কবিগান।

* দুজন গায়ক পরস্পরের যুক্তি খন্ডন করে যে গানে –

* দেব-দেবীর মহিমা যে গানে প্রকাশ পায় – কীর্তন।

* প্রাচীন বাংলার দৃশ্যকাব্যকে বলে – যাত্রা।

* বৈসুব,সাংগ্রাই , বিজু এর প্রথম বর্ণের সমাহারে হয় – বৈসাবি।

* আবাল বৃদ্ধ বণিতা বলতে বােঝায় – সব বয়সের নারী পুরুষ।

* বাংলার স্বাধীনতা অর্জনে সক্রিয় ছিল – নববর্ষের প্রেরণা।

* বাঙালি বাধা পেয়েছিল পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে – নববর্ষ উদ্যাপনে।

* নববর্ষ উৎসব পরিনত হয়েছে – বাঙালির প্রাণের উৎসবে।

* সম্রাট আকবরের আমল থেকে – বাংলা সনের গণনা শুরু হয়।

* নববর্ষে পুণ্যাহের আয়ােজন করতেন – নবাব ও জমিদাররা।

* বিভিন্ন লােকমেলার আয়ােজন হয় – বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ।

* পাহাড়ি বাঙালিরা নববর্ষে পালন করে – বৈসাবি অনুষ্ঠান।

* নববর্ষ উৎসব বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে – ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকে।

* বাঙালির জীবনে গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে – নববর্ষ অনুষ্ঠান।

* বাঙালি গৃহিণীরা বছরে এ দিবসটি উদযাপন করে – আমানি সহ নানান ব্রত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

* ছায়ানট হলাে – বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১ সালে।

* নববর্ষ পালন শুধু আনন্দ উচ্ছ্বাসই নয় – সকল মানুষের কল্যাণ কামানার দিন।।

* রমনার পাকুড়মূলে ছায়ানট নববর্ষের উৎসব শুরু করে – ১৯৬৭ সাল থেকে।

* নববর্ষে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শােভাযাত্রা বের করে – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র ছাত্রীরা।

* সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেন – চান্দ্র হিজরি সনের সংঙ্গে ভারতবর্ষের সৌর সনের সমন্বয় সাধন করে।

* বাংলা সন চালু করা হয় – হিজরি ৯৯২ সালে।

* হালখাতা অনুষ্ঠানটি করতেন – ব্যবসায়ীরা।

* প্রাচীন বৈশাখী মেলা – ঠাকুরগাঁ জেলার রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদের মেলা এবং চট্টগ্রামের মহামুনির বৌদ্ধ পুর্নিমা মেলা।

* বিখ্যাত কুস্তি খেলাকে বলা হয় – বলী খেলা।

* বলী খেলার প্রচলন শুরু হয় – ১৯০৭ সাল থেকে কক্সবাজারসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের নানা স্থানে।

* বলী খেলার প্রবর্তন করেন – আবদুল জব্বার ।

* নববর্ষের একটি প্রাচীন আঞ্চলিক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের নাম – আমানি।

* নববর্ষে গরুর দৌড় , হা-ডু-ডু খেলা অনুষ্ঠিত হয় – মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলায়।

* নববর্ষে ষাঁড়ের লড়াই অনুষ্ঠিত হয় – কিশোরগঞ্জ,নেত্রকোনা ও নড়াইলে।

* বাংলা নববর্ষ উদযাপন – আনন্দময় ও সৌহার্দ্যপুর্ন পরিবেশ তৈরী করে।

 

জ্ঞানমূলক প্রশ্নোত্তরঃ

প্রশ্ন-০১। মুগল সম্রাট আকবর কত সালে বাংলা সন চালু করেন ?

উত্তরঃ মুগল সম্রাট আকবর ১৯৫৬ সালে বা ৯৯২ হিজরিতে বাংলা সন চালু হয়।

প্রশ্ন-০২। ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য কী?

উত্তরঃ ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলাে খাজনা আদায়।

প্রশ্ন-০৩। চট্টগ্রামে বাংলা নববর্ষে কোন মেলা বসত ?

উত্তরঃ চট্টগ্রামে বাংলা নববর্সে মহামুনির বৌদ্ধপূর্ণিমা মেলা বসত।

প্রশ্ন-০৪। হালখাতা কী ধরনের অনুষ্ঠান ?

উত্তরঃ হালখাতা ব্যবসায়ীদের বাকির টাকা মিটিয়ে নতুন বছরের নতুন খাতা খােলার আনন্দময় অনুষ্ঠান।

প্রশ্ন -০৫। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী কে ছিলেন ?

উত্তরঃ যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা এ.কে, ফেজলুল হক।

প্রশ্ন-০৬। বাংলা সনের প্রথম মাসে নাম কী ?

উত্তরঃ বাংলা সনের প্রথম মাসের নাম বৈশাখ

প্রশ্ন-০৭। সাল কথাটি কোন ভাষা থেকে এসেছে ?

সাল কথাটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে।

প্রশ্ন-০৮ । বাংলা সন চালু করেন কোন শাসক?

উত্তরঃ মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করেন।

প্রশ্ন-০৯। কত হিজরিতে বাংলা সন চালু হয় ?

উত্তরঃ ৯৯২ হিজরিতে বাংলা সন চালু হয়।

প্রশ্ন-১০। বৈসব, সংগ্রাই ও বিজু-এই তিনটি একত্রে কী উৎসব নামে পরিচত ?

উত্তরঃ বৈসব, সাংহাই ও বিজু এই তিনটি একত্রে বৈসাবি উৎসব নামে পরিচিত।

প্রশ্ন-১১। ‘মঙ্গল শােভাযাত্রা’ কী ?

উত্তর ও মানুষের মঙ্গল কামনা করে যে মিছিল বের করা হয় তা-ই মঙ্গল শােভাযাত্রা।

প্রশ্ন-১২। বাংলাদেশের অফুরান প্রাণের আবেগ আর গভীর ভালােবাসায় উদ্যাপিত উৎসবটির নাম কী ?

উত্তরঃ বাংলাদেশের অফুরান প্রাণের আবেগ আর গভীর ভালােবাসায় উদযাপিত উত্সবটির নাম বাংলা নববর্ষ ।

প্রশ্ন-১৩। কোনটি নববর্ষের একটি প্রাচীন আঞ্চলিক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান ?

উত্তরঃ ‘আমানি’ হচ্ছে নববর্ষের একটি প্রাচীন আঞ্চলিক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান।

প্রশ্ন-১৪। নেকমরদের মেলা কোথায় বসে?

উত্তরঃ নেকমরদের মেলা বসে ঠাকুরগা জেলার রানীশংকৈল উপজেলায় ।

প্রশ্ন-১৫। চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রাচীন বৈশাখী মেলাটির নাম কী ?

উত্তরঃ চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রাচীন বৈশাখী মেলাটির নাম-মহামুনির বৌদ্ধপূর্ণিমা মেলা।

প্রশ্ন-১৬। গ্রামবাংলায় নববর্ষে নানা খেলাধুলার মধ্যে ষাঁড়ের লড়াই অনুষিঠিত হতাে ?

উত্তরঃ গ্রাম বাংলায় নববর্ষে নানা খেলাধুলার মধ্যে নড়াইলে ষাড়ের লড়াই অনুষ্ঠিত হতাে।

প্রশ্ন ১৭। চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশেষ আঞ্চলিক খেলাটির নাম ‘বলী’ খেলা ।

প্রশ্ন-১৮। পুণ্যাহ’ শব্দের অর্থ কী?

উত্তরঃ ‘পুন্যাহ’ শব্দের অর্থ পুণ্যের জন্য আয়ােজিত অনুষ্ঠান।

 

অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর-

প্রশ্ন-০১। পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শােভাযাত্রা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকধর্মী চিত্র বহন করে-বুঝিয়ে লেখ।

উত্তরঃ পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শােভাযাত্রা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকী চিত্র বহন করে। কারণ তার মধ্য দিয়ে বাঙালির পরিচয় ফুটে ওঠে। রাজধানী ঢাকার নববর্ষ উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণাঢ্য যাত্রাই মঙ্গল শােভাযাত্রা। তারা নববর্ষ উদ্যাপনে নিজেদের আলাদা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তারা সব মানুষের মঙ্গল কামনা করে বর্নাঢ্য শােভাযাত্রা বের করেন। এই শােভাযাত্রায় মুখােশ, কার্টুনসহ যেসব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকধর্মী চিত্র বহন করা হয় তাতে আবহমান বাঙালিত্বের পরিচয় ও সমকালীন সমাজ-রাজনীতির সমালােচনা ফুটে ওঠে।

 

প্রশ্ন-০২। “আমানি’ অনুষ্ঠানকে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান বলা হতাে কেন ?

উত্তরঃ কৃষক-পরিবারের সবার কল্যাণ কামনায় আমানি পালন করা হয় বলে এ অনুষ্ঠানকে আঞ্চলিক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান বলা হয়।

আমানি প্রধানত কৃষকের পারিবারিক অনুষ্ঠান। চৈত্র মাসের শেষ দিনের সন্ধ্যারাতে গৃহকত্রী এক হাঁড়ি পানিতে অল্প পরিমাণ অপব্ধ চাল ছেড়ে দিয়ে সারারাত ভিজতে দেন এবং তার মধ্যে একটি কচি আমের পাতাযুক্ত ডাল বসিয়ে রাখেন। পয়লা বৈশাখের সূর্য ওঠার আগে ঘর ঝাড় দিয়ে গৃহকত্রী সেই হাঁড়ির পানি সারা ঘরে ছিটিয়ে দেন এবং পরে সেই ভেজা চাল সবাইকে খেতে দিয়ে আমের ডালের কচি পাতা হাঁড়ির পানিতে ভিজিয়ে বাড়ির সবার গায়ে ছিটিয়ে দেন। বাড়ির সবার কল্যাণ ও নতুন বছর সবার জন্য সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির হবে এই কামনায় এ অনুষ্ঠান করা হয়। আর এটি অঞ্চলবিশেষে উদযাপন করা হয়। তাই একে আঞ্চলিক মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান বলা হয়।

 

প্রশ্ন-০৩। পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠান লুপ্ত হওয়ার কারণ কী?

উত্তরঃ জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ায় পুণ্যাহ অনুষ্ঠান লুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলা সন চালু হওয়ার পর নববর্ষ উদযাপনে নানা আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত হয়। 

নবাব এবং জমিদারেরা খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে চালু করেন, ‘পুণ্যাহ অনুষ্ঠান। পয়লা বৈশাখে প্রজারা জমিদারবাড়িতে আমন্ত্রিত হতে। তাদের মিষ্টিমুখ করানাে হতাে। তবে মূল উদ্দেশ্য ছিল খাজনা আদায়। পরে জমিদারি প্রথার বিলুপ্ত ঘটায় পুণ্যাহ অনুষ্ঠান লুপ্ত হয়ে যায়।

 

প্রশ্ন-০৪। বাংলা সনের প্রবর্তন কীভাবে হয়েছিল ?

উত্তরঃ বাংলা সনের প্রবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু জানা যায় নি ।

ঐতিহাসিক ও পন্ডিতগণ মনে করেন, মুঘল সম্রাট আকবর চান্দ্র হিজরি সনের সঙ্গে ভারতবর্ষের সৌর সনের সমন্বয় করে ১৫৫৬ সাল ৯৯২ হিজরিতে বাংলা সন চালু করেন। অবশ্য আধুনিক গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, মহামতি আকবর সর্বভারতীয় যে ইলাহি সন প্রবর্তন করেছিলেন তার ভিত্তিতেই আকবরের কোনাে প্রতিনিধি বা মুসলমান সুলতান বা নবাব বাংলা সনের প্রবর্তন করেন।

 

প্রশ্ন-০৫। বাংলা নববর্ষকে আমাদের প্রধান উৎসব বলা হয়েছে কেন ?

উত্তরঃ বাংলা নববর্ষকে আমাদের প্রধান জাতীয় উৎসব বলা হয়েছে। কারণ ধর্ম-বর্ণ গােত্র নির্বিশেষে সব বাঙালি জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এ উৎসে মেতে ওঠে।

নতুন বছরের শুরুতে দিনের প্রথম প্রহরে দেশ ও জাতির কল্যাণ-কামনা করা হয়। বাঙালি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলে নববর্ষের দিনে জাতির মঙ্গল কামনা করে। বাংলাদেশের স্বাধনীতা আন্দোলনের পেছনে নববর্ষের প্রেরণাও সক্রিয় ছিল। কারণ পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাঙালি নববর্ষ উৎসব উদ্যাপন করেছিল। সর্বোপরি সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ একত্রে এ উৎসব পালন করায় নববর্ষ আজ আমাদের প্রধান জাতীয় উৎসব।

 

প্রশ্ন-০৬। ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানটি এখন আর তেমন সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় না কেন ?

উত্তরঃ এখন মানুষের হাতে নগদ টাকা আছে বলে ‘হালখাতা’ আর আগের মতাে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় না।

‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানটি করতেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় ফসল বিক্রির টাকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কৃষকসহ প্রায় কেউই নগদ টাকার মুখ খুব একটা দেখতে পেত না। ফলে সারা বছর বাকিতে তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কেনাকাটা করত। হালখাতার সময় তারা দোকানিদের বাকির টাকা পুরাে অথবা আংশিক মিটিয়ে দিত। কিন্তু এখন মানুষের হাতে নগদ টাকা থাকায় বাকিতে বেচাকেনা আগের মতাে ব্যাপক আকারে হয় না। তাই ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠানটি আর তেমন সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় না।

 

প্রশ্ন-০৭। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের ভূমিকা ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ বাংলা নববর্ষ উদযাপনের জন্য ছায়ানট সাংস্কৃতিক সংগঠন বেসরকারিভাবে সবচেয়ে সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত উদ্যেগ গ্রহন করে। 

পাকিস্তানি আমলে বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ উদযাপন বন্ধ করে দেওয়অ হয় সরকারিভাবে। সেই সময়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট সবচেয়ে সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে বেসরকারিভাবে বাংলা নববর্ষ উৎসব পালনের জন্য। ১৯৬৭ সালে থেকে রমনার পাকুড়মূলে ছায়ানট নববর্ষের যে উৎসব শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাধাহীন পরিবেশে এখন তা জনগণের বিপুল আগ্রহ-উদ্দীপনাময় অংশগ্রহণ দেশের সর্ববৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে ।

 

প্রশ্ন-০৮। বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কীভাবে ?

উত্তরঃ বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলা সন চালু হওয়ার পর থেকেই।

বাংলা সনের প্রথম মাষ বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। তারও আগে পহেলা অগ্রহায়ণে পালন করা হতাে নববর্ষ উৎসব। ক্রমশ এর সাথে যুক্ত হয়েছে পুণ্যাহ, হালখাতা, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি। পাকিস্তান আমলে এ উৎসব পালনে বিধিনিষেধ আরােপ করা হয়। কিন্তু ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার বাংলা নববর্ষ উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের জন্য পহেলা বৈশাখ ছুটি ঘােষণা করে। সামরিক শাসন জারি হলে তা বাতিল করা হয়। কিন্তু বেসরকারিভাবে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট রমনা পাকুড়মুলে নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু করলে এটি নতুন মাত্রা পায়। তখন থেকেই বাংলা নববর্ষ সর্ববৃহৎ জাতীয় উদ্যাবে পরিণত হয়। আর এভাবেই বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতিসত্তার সাথে যুক্ত হয়ে যায়।

 

প্রশ্ন-০৯। বৈশাখী মেলায় আগের জৌলুস এখন আর নেই কেন ?

উত্তরঃ বৈশাখী মেলায় আগের জেীলুস এখন আর নেই। এর কারণ তখন সারাদেশে আজকের মতাে এত বিস্তৃত যােগাযােগ ও যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল না।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রধান অনুষ্ঠান হলাে বৈশাখী মেলা। এক সময় গ্রামবাংলায় অনুষ্ঠিত বার্ষিক মেলাগুলাের গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। কারণ তখন সারাদেশে যােগাযােগ ব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। ফলে তখন আঞ্চলিক মেলাগুলাে থেকেই মানুষ সারা বছরের প্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র কিনে রাখত। আর এসব মেলা অঞ্চল বিশেষের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হতাে। বর্তমানে যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় মানুষ হয়েছে শহরমুখী। তাই বার্ষিক মেলাগুলাের মতাে বৈশাখী মেলার জৌলুসও কমে গেছে। মেলা আগের সেই গুরুত্ব হারিয়েছে।

 

প্রশ্ন-১০। বর্ণাঢ্য মঙ্গল শােভাযাত্রা কী? ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : রাজধানী ঢাকার নববর্ষ উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ণাঢ্য শােভাযাত্রাই মঙ্গল শােভাযাত্রা।

প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে ভােরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা নবর্ষ উদ্যাপনে নিজের আলাদা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। তারা সব মানুষের মঙ্গল কামনা করে বর্নাঢ্য মঙ্গল শােভাযাত্রা বের করেন। এই শােভাযাত্রায় মুখােশ, কার্টুনসহ যেসব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীকধর্মী চিত্র বহন করা হয়, তাতে আবহমান বাঙালিত্বের পরিচয় এবং সমকালীন সমাজ-রাজনীতির সমালােচনা ফুটে ওঠে।

Leave a Comment