বাঁচতে হলে হাসতে হবে – সৈকত ইসলাম

বাঁচতে হলে হাসতে হবে

………………………………

হাসি! সকল সফলতার সূত্র। এবং ভাল থাকার একমাত্র মূলমন্ত্র।

হাসুন, যখন ইচ্ছা হয় হাসুন। ইচ্ছা না হলেও হাসুন। কারণে হাসুন, অকারণেও হাসুন। আপনার হাসি দেখে যখন কেউ আপনাকে পাগল বলে সম্বোধন করবে তখন তার উত্তরে আবার হাসুন। হাসির বিকল্প কিছু নেই। দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসুন অথবা মুখ চেপে হাসুন, তবে হাসুন। হি হি, হো হো, হা হা – যেভাবে ইচ্ছা হাসুন।

ভাল থাকতে হলে হাসতে হবে। আমরা স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধি থেকে বুঝতে পারি, মানুষ সুখে থাকলে, ভাল থাকলে হাসে, ‘হাসি’ তার মুখে আপনা-আপনিই চলে আসে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ভাল থাকার কিংবা সুখে থাকার-ই একটা উপায় হলো ‘হাসি’। কথা টা অবাক করার মত হলেও সত্যি। ‘Yes!’ নামের একটা বিখ্যাত ম্যাগাজিন আছে। তাতে সুখী হওয়ার উপায় নিয়ে একটা ফিচার করা হয়েছিলো। সেখানে সুখী হওয়ার জন্য কয়েকটা উপায় তুলে ধরা হয়েছিলো। তার মধ্যে দুই নাম্বারে ছিলো ‘হাসি’ বা ‘Smile’। সেখানে বলা হয়, ‘Smile, even when you don’t feel like it.’ অর্থাৎ হাসুন, যখন আপনার সেরকম অনুভব হয় না, তখনও। হাসি না পেলেও হাসতে হবে। যখন হাসার জন্য কোনো কারণ নেই তখনও হাসতে হবে।

আমরা হাসির অপর নাম ‘জীবন’ দিলে খুব একটা ভুল হবে বলে মনে হয় না। একদল লোক হয়তো ওই লাইনটা পড়ার পরেই আড়চোখে আবার তাকিয়েছে ওই লাইন টার দিকে। এটা কেমন কথা? হাসির অপর নাম জীবন কিভাবে হয়? হাউ? এতদিন তো পড়ে আসলাম পানির অপর নাম জীবন। এখন হঠাৎ পানির অপর নাম জীবন হতে গেলো কেন? তাও আবার সরাসরি পানির অপর নাম জীবন বললেও লোকে ভুল ধরতে চায়। তারা আবার একেবারে নির্ভুলভাবে বলতে চায়। তারা বলবে বিশুদ্ধ পানির অপর নাম জীবন। তাহলে আমি হাসির অপর নাম জীবন কেন বলছি? এরকম শত শত প্রশ্ন এসে ভীড় জমাতে কিছু সংখ্যক পাঠকের মনে। এবং সেসবের উত্তর আমাকে অবশ্যই দিতে হবে। উত্তর না দিয়ে রেহাই কি! হ্যাঁ, পানির অপর নাম জীবন, বা, বিশুদ্ধ পানির অপর অপর নাম জীবন – দুইটিই সঠিক বলা যায়। পানি ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আমাদের শরীরে প্রায় ৭০ শতাংশ পানি। এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত পানির প্রয়োজন অবশ্যই আছে। তবে এ পানির থেকেও ‘হাসি’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। কিভাবে? পানি ছাড়া আমাদের শরীরের মৃত্যু ঘটে। আমাদের জীবনের অবসান ঘটে। আমরা মারা যাই। আর হাসি ছাড়া? হাসি ছাড়া আমাদের মনের মৃত্যু ঘটে। আমরা হয়ে যাই হৃদয়হীন, পাষাণ, নিষ্ঠুর। যা আমাদের মৃত্যু থেকে বিন্দুমাত্র কম ভয়াবহ নয়। জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকা যে মৃত্যু থেকেও কষ্টকর, বেদনাদায়ক। হাসি আমাদেরকে ‘মানুষ’ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখে। এজন্যই হাসির অপর নাম ‘জীবন’। পানির প্রয়োজন টা প্রত্যক্ষ, আর হাসির প্রয়োজন টা পরোক্ষ।

হাসতে হবে। কষ্টের সময়ও হাসার ক্ষমতা থাকতে হবে। নিজের কষ্টের কথা গুলো অন্যের সাথে শেয়ার করার সময়ও যেন আমাদের চেহারা থেকে হাসি হারিয়ে না যায়। মুচকি হাসি আমাদের চেহারায় তালাবদ্ধ করে রাখতে হবে। হাসার জন্য কোনো কারণের খোঁজ করাটা নিছক বোকামি মাত্র। বলা হয়ে থাকে, ‘Smile, even you have thousands reasons not to.’ অর্থাৎ হাসুন, যদি আপনার কাছে না হাসার জন্য হাজারখানা কারণও থাকে, তবুও। না হাসার কারণ থাকলেও আমাদের হাসতে হবে। এতে আমাদের মন জীবিত থাকবে। মনের মৃত্যু প্রতিহত হবে।

আমরা কেন হাসি? কেন আমাদের হাসি পায়? সব কিছুর মূলে রয়েছে হরমোন। আমাদের মস্তিষ্ক থেকে নানা প্রকার হরমোন নিসৃত হয়। যেসবের জন্য আমাদের নানা রকম অনুভূতি হয়। মস্তিষ্ক থেকে নিসৃত হরমোন গুলোর মধ্যে একটি হলো ‘ডোপামিন’। একে অনন্দের হরমোনও বলা হয়। অর্থাৎ আমরা যখন কোনো আনন্দ সূচক উদ্দীপনা গ্রহণ করি তখন মস্তিষ্ক ডোপামিন নিসৃত করা শুরু করি। ফলে আমরা অনন্দের অনুভূতি পাই। এবং আমাদের চেহারায় হাসি ফুটে উঠে। আমরা সব ক্ষেত্রে সরাসরি না হাসলেও চেহারায় সেসময় হাসির ছাপ খানা স্পষ্ট হয়। যেমন ধরুন, জানতে পারলেন আজকে আপনার বাসায় বিরিয়ানি রান্না হয়েছে। যখন খবরটি আপনি শুনবেন, শোনার সাথে সাথে আপনি হেসে দিবেন। অনন্দের হাসি। তৃপ্তিদায়ক হাসি। কারণ আপনার মস্তিষ্ক জানে আপনার বিরিয়ানি খুব পছন্দ। তাই এটা অনন্দের উদ্দীপনা হিসেবে মস্তিষ্কে গৃহীত হবে এবং ডোপামিন নিসৃত হবে। ফলে আমাদের অনন্দ লাগবে। আমাদের মস্তিষ্ক বড্ড বোকাসোকা ধরনের। আপনি আপনার মস্তিষ্ককে যা বুঝাবেন, মস্তিষ্ক তা-ই বুঝবে। মস্তিষ্ককে বোকা বানানো খুব একটা কঠিন কাজ নয়। মস্তিষ্ককে সহজেই বোকা বানানো যায় হাসি দ্বারা। আপনি যখন হাসবেন, আপনার চেহারায়, মাংসাশীতে, চামড়ায় যখন হাসির ছাপ ফুটে উঠবে তখন আপনার মস্তিষ্ক বোকা বনে যাবে। সে মনে করবে আপনি আনন্দেই আছেন। ফলে নিসৃত হবে ডোপামিন হরমোন। আর আপনি পাবেন আনন্দের অনুভূতি।

হাসিখুশি থাকার একটা বিরাট প্রভাব রয়েছে আমাদের চালচলন, আচার-আচরণ এবং আমাদের চিন্তাভাবনায়। আমরা যখন মন খারাপ করে থাকি তখন মস্তিষ্ক একভাবে কাজ করে, আর যখন ‘চাঙ্গা’ হয়ে থাকি তখন মস্তিষ্ক আরেকভাবে কাজ করে। মনখারাপ অবস্থায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর জন্য পরে পস্তাতে হয়। কারণ সেসময় মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তিগত চিন্তা না করে। তাই পরে যখন মন খারাপ ভাবখানা উবে যায় তখন সে সিদ্ধান্তের জন্য কেবল আফসোস-ই করতে হয়। তাই সব কাজের সময় মুখে মুচকি হাসি থাকা টা নিশ্চিত করতে হবে। কারও সাথে কথা বলার সময় মুচকি হেসে কথা বলতে হবে।  ফোনে কল আসলে ফোনটা হাতে নিয়ে আগে একবার মুচকি হেসে নিতে হবে, তারপর কল টা রিসিভ করতে হবে। এতে আমাদের কণ্ঠের উপর একটা অন্যরকম প্রভাব পড়বে। আপনি কোকিলকণ্ঠী না হলেও কিছুটা পার্থক্য নিশ্চয়ই আপনার কথার মধ্যে উপস্থিত হবে। মন খারাপ হয়েছে? খুব কষ্ট পেয়েছেন? আয়নার সামনে দাঁড়ান। নিজের দুঃখগুলোর কথা মনে করেই নাহয় একবার হাসুন। নিজেই নিজেকে হাসানোর ক্ষমতা থাকতে হবে। অন্যের স্বার্থে নয়, নিজের স্বার্থেই।

সবকিছু হাসি মুখে সহ্য করার ক্ষমতার চেয়ে বড় আর কিছু হয় না। জীবনের সব কিছু যদি হাসিমুখে গ্রহণ করা যায়, তাহলে আর কোনো অপ্রাপ্তি থাকে না, থাকে না কোনো দুঃখ কিংবা কষ্ট। কেউ আপনাকে কষ্ট দিয়েছে? অন্যায় করেছে আপনার সাথে? অবিচার করেছে। করুক। তাতে আপনার মন খারাপ করে থাকলে নিজের-ই ক্ষতি। তার দেওয়া কষ্ট, অন্যায়, অবিচারের বিচার করার দায়িত্ব নাহয় সর্বশক্তিমান সৃষ্টা মহান রব্বুল আলামিনের উপর ছেড়ে দিন। তিনি নিশ্চই অবিচার করবেন না, অন্যায় করবেন না। তাঁর বিচারে নিশ্চই আপনি নিরাশ হবেন না।

হাসির গুরুত্ব কোনো ক্ষেত্রেই কম নয়। হাসলে লাভ বৈকি ক্ষতি নেই। হাসলে সাওয়াব পাওয়া যায়। তবে সে হাসি মুচকি হাসি হলেই অধিক গ্রহণীয় হয়। আমাদের মহানবী(সাঃ) মুচকি হাসতেন। তাই মুচকি হাসা সুন্নাত। আর, সুন্নাত পালনে সাওয়াব আছে তা কারও অজানা নয়। একটা হাদিস আছে – মহানবী (সাঃ) বলেন-

‘কোনো ভাল কাজকেই ছোট মনে করো না, এমনকি যদি সেটা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলাও হয়।’ (সহিহ মুসলিমঃ২৬২৬)

আবার, আল-কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

‘অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে।'(সূরা যিলযাল, আয়াত-৭)

মহানবীর সুন্নাত নিঃসন্দেহে সৎকর্ম। আর আল্লাহ সুবানাহু  তায়ালা পরকালে নিশ্চয়ই তার উত্তম বদলা দিবেন।

কাঁদতে হয় গোপনে, হাসতে হয় প্রকাশে। যখন খুব রান্না পাবে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে, ঘর‍কে ঘুটঘুটে অন্ধকার করে নিয়ে একেলা কাঁদুন। অথবা বাথরুমে একলা কাঁদুন। মন থেকে দুঃখের ভার কমে যাওয়া মাত্র কান্না থামিয়ে আবার হাসা শুরু করুন।চোখে মুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। যেসব গোপন শত্রু আপনার মুখে কষ্ঠের ছাপ দেখলে মজা পায়, হয়তো আপনার থেকে আড়ালে হেসে কুটিকুটি হয়। তাদের সামনে দুঃখকে লুকিয়ে হাসিখুশি থাকুন। আপনার অনন্দে ( নকল হোক কিংবা আসল) তারা নিশ্চয়ই আশাহত হবে, তাদের মনের ভিতরে নিঃসন্দেহে দুঃখের জোয়ার আসবে।

তবে হাসির ক্ষেত্রে সামান্য ‘লিমিট’ না রাখলেই নয়। হাসতে না পারা যেমন মনের তথা অন্তরের মৃত্যু ঘটায়। তেমনি অধিক হাসিও অন্তরের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। একটা হাদিস শুনেছিলাম। তবে ঠিক মনে নেই। হাদিস টা এমন – তোমরা অধিক হাসাহাসি করো না, কারণ তা অন্তরের মৃত্যু ঘটায়।

Robert Downey Jr ( যিনি হলিউডে তাঁর Tonny stark তথা iron man চরিত্রের জন্য বেশ বিখ্যাত) হাসির ব্যাপারে বলেন, ‘Smile, though your heart is aching. Smile, even though it’s breaking. When there are clouds in the sky. You can buy it.’ 

আরিফ আজাদের মত করে বলতে গেলে, ‘যারা হাসতে পারে, তাদের প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষ হিসেবে দেখা হয়। তাদের মনের মধ্যে সবসময় একটা আশার আলো জ্বলজ্বল করে।’

 

লেখকঃ সৈকত ইসলাম

ক্যাটাগরিঃ আর্টিকেল

Leave a Comment